Tuesday

Tagged under: ,

প্রতিশোধ : The Revenge


“অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহবান,
প্রানের প্রথম জাগরনে তুমি বৃক্ষ আদিপ্রান।” - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
[১]
তার চোখ নেই কিন্তু সে দেখছে। দেখছে, অনুভব করছে সবকিছু। সে দেখছে দিনদিন তার বংশধররা, তার প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আগে এই বিলুপ্তির ধারা ছিল ধীরে ধীরে কিন্তু এখন দিন দিন সেটা দ্রত হতে দ্রুততর হচ্ছে,। আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে সমস্যাটা। কিন্তু সে কিছুই করতে পারছে না। শুধু চাপা কষ্ট আর দুঃখ বয়ে বেড়াচ্ছে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এই প্রাণীগুলো কত নিষ্ঠুর, কত অকৃতজ্ঞ। তারা নিজের আশ্রয় দাতাকে ভূলে যাচ্ছে, ভূলে যাচ্ছে পালনকর্তা, অন্নদাতাকে। সে স্মৃতি হাতড়ে চলে গেল সেই টারসিয়ারী যুগে, জুরাসিক যুগে। মহাকালের ভাজে ভাজে খুজে দেখল। হ্যা, এইতো ধারাবাহিক ভাবে সব মনে পড়েছে। এই সুন্দর গ্রহ, বিশ্বভ্রক্ষান্ডের একমাত্র প্রাণ সমৃদ্ধ গ্রহ, এটা তো একদা আমাদেরই রাজত্বে ছিল। শুধু আমরাই ছিলাম। যেদিকে দৃষ্টি যেত শুধূ সবুজ আর সবুজ আর ছিল সাগরের নীলাভ পানি। সেই পানির নিচেও আমাদের বংশধরদের রাজত্ব ছিল। আসমান ছোয়া বৃক্ষগুলি প্রতিদিন খেলা করত মেঘবালিকার সাথে। মেঘবালিকা কত ভালবাসতো তাকে, দান করত অমৃত জলধারা আর পূর্বে উদিত সে নক্ষত্র শীতল রাখত মায়ের আচল। কথা হত মেঘবালিকা,সূর্য আর রাতের চাদ কিংবা তারার সাথে। মেঘ আর সূর্য প্রায়ই একে অপরকে সহ্য করতে পারত না। যখন মেঘকে নিমন্ত্রম করতাম, অভিমানে সূর্য তখন লুকিয়ে পড়ত কিংবা যখন সূর্যকে নিমন্ত্রম করতাম তখন অভিমানে মেঘ ডানা মেলে উড়ে যেত। কিন্তু তারকারাজি এবং চাদ ছিল একে অপরের ভাল বন্ধু, প্রতি রাতে তারা আমায় ডাকত। আমিও নেচে গেয়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানাতাম। কিন্তু এখন ওরা সবাই আমার শত্রু হয়ে যাচ্ছে এই নিষ্ঠুর প্রাণীগুলোর জন্য। মেঘবালিকা এখন আর আমার ডাকে সাড়া দেয় না, সূর্য কষ্ট দেয় আমার জননীকে। কত সাত-পাচ ভাবে, কিন্তু অতীতকে সে বিষন্ন করে তুলতে চায় না।

স্মৃতির পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় পাঠ করে সে- হ্যা এই তো পাওয়া গেছে। কত যত্নে আমি ওদের আগলে রেখেছিলাম, আশ্রয় দিয়েছি আচল তলে, অন্ন দিয়ে বাচিয়ে রেখেছি প্রাকৃতিক বিপর্যয় আর স্রষ্টার অভিশাপ হতে। এরা কত অসহায় ছিল, আমিইতো এদের লুকিয়ে লুকিয়ে রাখতাম শত্রুর আক্রমন হতে। নাহ্ এরা বড় অকৃতজ্ঞ, এরা মানুষ, এরা নিশ্চয়ই বড় অকৃতজ্ঞ জাতি, এরাতো নিজেরাই একে অপরকে ধ্বংস করে ফেলছে। এটা পৃথিবী, অপূর্ব সুন্দর আর চিরকল্যানময়। এখানে এমন অকৃতজ্ঞদের বাস করার কোন অধিকার নেই, এরা খুবই কুৎসিত জাতি। আর নাহ, কিছুতেই ওদের এই অসৎ উদ্দেশ্য সহ্য করা হবে না। তীব্র প্রতিশোধের নেশায় জ্বলে ওঠে সে। ওরা কি নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যাবে না কি আমাকেই প্রতিশোধ নিতে হবে? কিন্তু এখনও তো আমি ওদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন তবে কেন আমাকে ওরা ধ্বংস করে দিতে চায়? ওরা কি বুঝতে পারছে না যে, আমি অস্থিত্বহীন হয়ে পড়লে ওরাও অস্থিত্বহীন হয়ে পড়বে?
অবশেষে এই রহস্যের উৎঘাটন করল সে- নাহ্ , আমার ধ্বংসের পরও ওরা ধ্বংস হবে না। ওরা টিকে থাকবে আরো কোটি-কোটি বছর, মানব সভ্যতার বিজ্ঞানের অগ্রগতি তাদের সমস্ত মুল্যবোধের বিকাশকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ওরা জীবিকা আর খাদ্যের অন্বেষণনে চলে যাচ্ছে মাটির তলদেশে, সমুদ্রের গভীরে। আমার বিলুপ্তির পর ওরা ভূগর্ভের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং ততদিনে ওরা নিশ্চয়ই বেচে থাকার একটা অবলম্বন পেয়ে যাবে। ওরা প্রস্তুত করবে কৃত্রিম খাদ্য, এমন কি মাটিস্থ প্রোটিন বের করে ওরা খাদ্য তৈরী করবে, তবুও ওরা আমাকে বাচতে দেবে না। এরই মধ্যে আমাকে প্রতিশোধ নিতে হবে। প্রতিশোধের নেশায় হিস হিস করে ওঠে সে। এক প্রকার হিংস্র বাতাস গাছের শাখাগুলোকে যেন দুমড়ে মুচড়ে ফেলছে।

এই পৃথিবীতে আমিই প্রথম এসেছি, প্রানের স্পন্দন ঘটিয়েছি আর ওরা কিনা আমাকেই মেরে ফেলতে চায়? ক্ষোভের সাথে মানুষ গুলোর দিকে তাকায় সে- কেমন বিশ্রী শব্দ করে, কেমন কুৎসিত কাঠামো আর কেমন গর্বভরে পৃথিবী প্রকম্পিত করে? যেমন রুক্ষ তাদের চেহারা তেমন রুক্ষ তাদের ব্যবহার । কান্না আসে তার- এমন অকৃতজ্ঞদের আমি কোটি-কোটি বছর লালন করেছি? বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তার।
নাহ্ , আমাকে বাচতেই হবে। জীবনের স্পন্দনে আমিইতো প্রথম প্রান। আমিইতো এতদিন আশ্রয় দিয়ে সবাইকে টিকিয়ে রেখেছি আর আজ আমিই এখানে থাকতে পারব না? তা হয় না, এই পৃথিবী আমার। অঝোর ধারায় কাদছে সে।
পৃথিবীর কোটি কোটি বছরের ইতিহাস পাঠ করল সে, প্রানের সমস্ত রহস্য নিংড়ে বের করে আনল। সমস্ত রহস্যের সমাধান দেওয়া আছে সেখানে। দেওয়া আছে শত্রুকে ধ্বংস করার কৌশল, আত্মরক্ষার উপায়। সব, সব আছে সেখানে। সে সমাধান খুজে পায়- তাকে মরতে হবে। বাচতে হলে মরতে হবে, তবে মরার আগে মরতে হবে- হ্যা, এই তো পেয়ে গেছি । এতদিনে এই মানুষগুলিকে একটা উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পারব, যেন ভবিষ্যতে কোন প্রজাতি নিজেদের মানুষ দাবি করতে লজ্জা পায়। আমি সেই ব্যবস্থাই করব।

হঠাৎ এক টুকরো মেঘ ওর মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায়। কান্না জড়িত কন্ঠে সে ডাক দেয়- মেঘ ভাই, কই যাও? একটু দাড়াও না। কতদিন তোমায় দেখি না। আমার কষ্ট হয় না বুঝি? অভিমান ঝরে পড়ে তার। পরিচিত কণ্ঠ পেয়ে থমকে দাড়ায় মেঘ- কি করব বোন? তোমরা নেই তাই এখন আর পৃথিবীময় ঘোরার ইচ্ছে জাগে না। সূর্যটা যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ে তখন সে ডাক দেয়- সূর্যি মামা, আজ আমার সাথে কথা বলনি কেন?
-তোমায় বিষন্ন দেখে কষ্ট হয়, মেঘবালিকা আর আগের মত আসে না, তাই তোমার কষ্ট আর বাড়াতে চাই না। কষ্ট চেপে রেখে বলে সূর্যি মামা ।
সন্ধ্যার পর একটুকরো বাতাস যখন তাকে পরশ বুলিয়ে যায়, সে ডাক দেয়- ও ভাই, দিনের শেষে এলে তাও ক্ষনিকের জন্য। দাড়াও না ভাই, কিছু কথা বলি।
সে বুঝতে পারছে, দিনদিন সবাই দূরে সরে যাচ্ছে, প্রিয়জনরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এভাবে আর চলতে দেয়া যায় না । প্রতিশোধ নিতে হবে, চরম প্রতিশোধ। থরথর করে কেপে ওঠে সে।

[২]
তখনও শেষ বিকেলের আলো ফুরিয়ে যায় নি, অন্যসব দিনের মতই চলছে সবার কাজকর্ম। ব্যস্ত তরুন-তরুনীরা বিপনী বিতান গুলোতে কেনাকাটায় ব্যস্ত, কেউবা হাটছে পার্কে, মাঠে অথবা নদীর ধারে। সারাদিনের অফিস শেষে সবাই ঘরে ফিরছে। কারো মধ্যে দুঃচিন্তার ছাপ নেই। সবার মধ্যে একই কথা ‘শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না।’ টেলিভিশনে কিছুক্ষন পর-পরই প্রচার করা হচ্ছে ভয়াবহ ভবিষ্যৎবানী। বিজ্ঞানীরা আগত সাইক্লোনটির নাম দিয়েছেন ‘রিভেনজ’ (Revenge)। প্রতিটি বেতার কেন্দ্র হতে ঘোষনা করা হচ্ছে সমুদ্রের মাঝিরা যেন সন্ধ্যের পূর্বেই ফিরে আসে। কেউ-কেউ ফিরল, কেউ ফিরল না। উপকূলীয় এলাকা গুলোতে পুলিশ আর সামরিক বাহিনীর লোকজন গিয়ে মাইকিং করছে কিন্তু কারো আগ্রহ নেই সাইক্লোন শেল্টার স্টেশন গুলোতে যাওয়ার, একপ্রকার বাধ্য করেই সবাইকে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। সন্ধ্যের সাথে সাথেই আকাশে জমে উঠল কালো মেঘ। অনেকে উৎকণ্ঠায় তাকালো আকাশে। অভিজ্ঞতার আলোকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের আর বুঝতে বাকি রইল না এ কিসের আলামত, এ যে মত্যুর পরওয়ানা নিয়ে আসছে মৃ্ত্যুদূত ‘রিভেনজ’ (Revenge) । দশ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের তাৎপর্য এবার কেউ-কেউ কিছুটা অনুভব করছে। সবাই ছুটছে দ্বিগ্ববিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে। ছুটছে আশ্রয়ের আশায়, ছুটছে বেচে থাকার আশায়। বহন যোগ্য সম্বলটুকু কাপড়ে বেধে ওরা ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসল। চোখের জল ফেলতে-ফেলতে মুক্ত করে দিল গবাদি পশু-পাখিদের।
রাত নামার সাথে-সাথেই সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠল, বাতাসের গতিবেগ ক্রমেই বাড়ছে। রাত্রির প্রথম প্রহরেই আঘাত হানল প্রলয়ংকরী সাইক্লোন ‘রিভেনজ্’ (Revenge) । প্রায় পাচশত কিলোমিটার বেগে ঝড়টি আঘাত হানল সারা রাত্রি ধরে। লন্ড-ভন্ড করে দিল কোটি-কোটি মানুষের ঘর-বাড়ি, ফসলের ক্ষেত , সন্তান-সন্ততি আর গবাদি পশু-পাখি।
সকাল হল। আকাশে বাতাসে শুধু মানুষের চিৎকার আর হাহাকার। স্বজন হারানোর কান্নায় পৃথিবীর আকাশ ভারী হয়ে উঠল। পৃথিবীর বাতাসে শুধুই লাশের গন্ধ। এখন শুধুই বেচে থাকার আকুতি। চাই খাদ্য আর পানি। পর্যাপ্ত ত্রাণ।। কিন্তু কে দেবে তাদের সাহায্য। রাস্তাঘাট সব বিধ্বস্ত , স্থল যোগাযোগের কোন উপায় নেই, রাস্তার উপর ভেঙ্গে পড়ে আছে শতবর্ষী গাছগুলোও। চারিদিকে লক্ষ-লক্ষ মানুষের লাশ আর লাশ, লাশের মিছিলে মানবতা খুজে পাওয়া ভার। সবার চোখে মুখে উৎকণ্ঠা, প্রকৃতি এ কি নিষ্ঠুর খেলা খেলল মানুষের জীবন নিয়ে, প্রকৃতি এ কেমন প্রতিশোধের নেশায় মেতে উঠল?

[৩]
বিস্তীর্ন ধান ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে করিম মিয়া। এক দাগে দশ একর জমি তার । গত বছরও এখানে ছিল সুউচ্চ গাছের সমাহার। মৃত্যুর সময় বাবা বলেছিল একসাথে যেন সব উজাড় না করে আর অবশ্যই যেন নতুন গাছ লাগায়। একদিন শহরের এক পার্টি আসে, চড়া দাম হাকে। কাচা টাকার গন্ধ পেয়ে করিম মিযা সব গাছই বিক্রি করে দেয়। সে এখন কোটি টাকার মালিক, এলাকার সবচেয়ে বড় ধনী। প্রতিবেশীরা বলেছিল আবার গাছ লাগাতে। কিন্তু আবার পনের, বিশ বছর। নাহ্ , বাকীতে বিশ্বাসী নয় করিম মিয়া। তার চাই কাচা টাকা, নগদ টাকা। সে ধান আবদ করে, বছর না ঘুরতেই আসবে টাকা, করিম মিয়া উঠোনে বসে ভাবে আর পান চিবোয়। কিন্তু এখন যেন তার কান্না আসছে, দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বাড়ন্ত ধানের চারা গুলি কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে। যত্মতো কম হচ্ছে না, নিজের মেশিন, পর্যাপ্ত পানি, সার, তবুও চারা গুলি দিনিদিন শুকিয়ে যাচ্ছে। করিম মিয়া ছুটে যায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছে। উপজেলা কৃষি অফিসারসহ সবাই সরেজমিনে পরিদর্শন করল।

কয়েক বছরের মধ্যেই কৃষি মন্ত্রনালয়ে জমা পড়ে হাজার হাজার প্রতিবেদন। নির্দিষ্ট কোন কারণ খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। সবর্ত্র একই অবস্থা। প্রকৃত কারণ খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই হতাশ। এভাবে কেটে গেল বহু বছর।

[৪]
লম্বা কাঠের টেবিলের এক প্রান্তে বসে আছেন মাননীয় মিরান। সম্মেলন কক্ষের সবাই নিরব। কথা সরছে না কারো মুখে। তিনি তাকিয়ে আছেন টেবিলটির দিকে আর ভাবছেন , এই টেবিলটা তৈরি করতে কত ব্যয় হয়েছিল? অনেক, অনেক টাকা, একটা কৃত্রিম বন তৈরী করা যেত। অথচ কত বিলাসিতা করা হয়েছিল, হেলিকপ্টারে করে সেই আমাজান হতে দূর্লভ প্রজাতির এই গাছ সংগ্রহ করা হয়েছিল।
নিরবতা ভঙ্গ করল একজন পরিবেশবিদ- স্যার নি:সন্দেহে আমরা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছি।
-ডাইনোসর ছিল নির্বোধ প্রাণী। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে তাই তারা হারিয়ে গেছে। হেরে গেছে। কিন্তু আমরা? আমরা মানুষ। সৃষ্টির সেরা জীব। আমরাও হেরে যাব প্রকৃতির কাছে? মাঠের ঘাস শুকিযে মাটি বের হয়ে এসেছে। শহর ছেড়ে বেরুলেই শুধু ধু-ধু মরুভূমি আর পোড়া মাঠ। সবুজের চিহ্ন মাত্র নেই। পৃথিবীতে এটা কি হচ্ছে? উপকূলীয় সবদেশগুলো পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের উচ্চতা দিন-দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মারাত্মক ভাবে গলে গেছে এন্টার্কটিকার বরফ। সবচেয়ে করুন হচ্ছে অনুন্নত আর উন্নয়নশীল দেশগুলো, দুর্ভিক্ষ আর গৃহ যুদ্ধের কবলে পড়ে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ছে। এখনও যারা টিকে আছে শুধু তাদের মজুদ খাদ্যের জোরেই। কেউ কাউকে সাহায্য করছে না। উপরন্তু এক জাতি তাতারি কিংবা বেদুইনদের মত অন্য জাতির উপর হামলে পড়ছে। সমুদ্রের গর্ভে খাদ্য হিসেবে যা ছিল তাও দিন দিন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সমস্ত উদ্ভিদও মরে গেছে। পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। অথচ এখানে উপস্থিত আছেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আর মহাজ্ঞানীরা, যারা বলতে পারেন মহাবিশ্ব কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, পৃথিবীর বয়স কত, মঙ্গল গ্রহের মাটিতে কি কি উপাদান আছে। কিন্তু এখন, কি কাজে আসবে তাদের সেই জ্ঞান যদি আমরাই টিকে না থাকি। মহাবিশ্বে পৃথিবীই তো একমাত্র মানুষের বসবাস উপযোগী গ্রহ তাহলে এই পৃথিবী ছেড়ে আমরা যাবো কোথায়, কি খাব, কিভাবে বাচবো? গত সম্মেলনে আপনারা আমাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা অত্যাধিক প্রোটিন সমৃদ্ধ এক প্রকার রাসায়নিক খাদ্য তৈরী করতে সক্ষম হবেন, কিন্তু এখনও তার কোন অগ্রগতি নেই। অথচ প্রতিদিন পথে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে মৃত লাশ। পৃথিবীর আবহাওয়া বিষাক্ত হয়ে উঠছে, কিন্তু আপনারা কিছুই করতে পারছেন না অথচ এক সময় সবাই গর্বভরে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়িয়েছেন যেন আপনাদের পদভারেই ধন্য ছিল পৃথিবী। ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ। লজ্জা, লজ্জা, এটা মানব জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ লজ্জার বিষয়।
ক্ষোভের সহিত মুখ বিকৃত করলেন ড. মিরান।

- আজ এখানে সবাই অপরাধী। সবার অবনত মস্তক। আজ নেই কারো অহংকার কিংবা গর্ব। আজ কেউ কারো নয়।। একদা যে বলত আমিই মঙ্গলে প্রথম পদচারী ব্যক্তি, আমিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী কিংবা শ্রেষ্ঠ ক্ষমতাধর, আমি কৃত্রিম মানব তৈরীর গুপ্ত রহস্য জেনেছি, মানব সভ্যতা ধ্বংসকারী পারমানবিক অস্ত্র ও ন্যানোমাইন তৈরীর গুপ্ত রহস্য আমি জেনেছি। আজ কোথায় তারা? আজ কথা সরছে না কারো মুখে। আচ্ছা চিন্তা করুন আগামীকাল যখন খাদ্য ফুরিয়ে আসবে, কি করবেন? আপনাদের মধ্যে কি এমন একজন মাত্র ব্যক্তি নেই যিনি এর সমাধান দিতে পারবেন। একজন, শুধু একজন। কান্নাজড়িত কন্ঠে থরথর করে কেপে উঠলেন বৃদ্ধ মিরান। আপনাদের অনভূতি কি ভোতা হয়ে গেছে? বুঝতে পারছেন তো পৃথিবী তথা মহাবিশ্ব হতে মানব সভ্যতার বিলুপ্তি ঘটতে যাচ্ছে? কেউ একজন কথা বলুন। আপনাদের আমি পৃথিবীর ঐসব শোষিত নিরক্ত মানুষের কসম দিয়ে বলছি যাদের অর্থে আপনারা উন্নত জাতির মহাজ্ঞানী উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। কেউ নেই। আজ যারা জীবিত তারাও মৃত। আপনারা সবাই শুধু ধ্বংসের ফর্মুলা মন্থন করে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ হয়েছেন, কিন্তু সৃষ্টির সুতোটা কেউ ধরতে পারেন নি, এমন কি কেউই রক্ষনাবেক্ষন প্রক্রিয়াটুকুও দেখাতে পারেন নি।

পুরো সম্মেলন কক্ষে থমথমে নিরবতা।
-আচ্ছা কেউ যেহেতু পারছেন না তাহলে আমিই একটা সমাধান দিচ্ছি। কাপা কাপা কন্ঠে বলতে লাগলেন ড. মিরান। এই দেশে এখন আমরা যারা টিকে আছি তাদের জন্য প্রায় দশ বছরের খাদ্য মজুদ আছে।
সবাই অবাক হল, একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল।
-অবাক হবেন না। এটা ছিল অতি গোপনীয়, যা শুধু জানতাম আমি আর মুষ্টিমেয় বিশ্বত্ব লোকজন। আরো আছে বেশ কিছু ওষুধ পত্র। কিন্তু পৃথিবীর আবহাওয়া বিষাক্ত হয়ে গেছে। এ আবহাওয়ায় আমরা আরো দুটো বছরও টিকতে পারব না । তার চেয়ে এই ভাল , আমাদের নিকটবর্তী যে দুটো দেশের কিছু মানুষ এখনও টিকে আছে তাদের মাঝে কিছুটা খাদ্য বিলিয়ে দেই যেন তারাও আরো কিছুদিন বেশী বাচতে পারে, নতুবা দু’মাস পরেই ওদের খাদ্যও ফুরিয়ে যাবে।
আর্তনাদ করে উঠল সবাই- নাহ, মহামান্য মিরান, নাহ। নাহ! আমরা অবশ্যই খাদ্য ফুরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত বেচে থাকার চেষ্টা করব। আমরা কিছুতেই সেটা করতে দেব না। প্রতিবাদ করল জর্জ রর্বাটসন।
তরুন বিজ্ঞানীর দিকে তাকালেন মিরান – না রর্বাট, আমি কারো পরামর্শ ছাড়া কিছুই করি নি এবং করব না। সবার মত আমিও আশাবাদী।
সেদিনের মত আলোচনা শেষ হল কোন প্রকার সমাধান ছাড়াই।

ধীর পদক্ষেপে হাটছেন মিরান। কখনো সমুদ্রের বেলাভূমিতে, কখনো খোলা মাঠে অলস সময় কাটান। বড়-বড় অট্রালিকাগুলোর দিকে তাকিয়ে নিরবে চোখের জল ফেলেন। ওগুলো এখন সব অভিশপ্ত। জেটিতে বাধা বিশালাকার জাহাজগুলো ফাকা পড়ে আছে। এয়ার ক্রাফট কেরিয়ারগুলোর উপর শতশত যুদ্ধ বিমান, সবই এখন নিশ্চল। পৃথিবীতে বিজ্ঞানের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল শুধূ মানুষ হত্যা করার জন্য। শতশত বন উজাড় করে তৈরী করা হয়েছিল সামরিক ঘাটি, পারমানবিক স্থাপনা। অধিকাংশ ভূমি কিংবা বনভূমি গুলো দখল করে রাখত সামরিক বাহিনীরা। সরকার সর্বোচ্চ অর্থ ব্যয় করতো যুদ্ধ খাতে। অথচ কেউ ভাবেনি পরিবেশ নিয়ে। পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসেনি কেউ। আজ কোথায় তারা যারা মানুষ হত্যা করে তৃপ্তি লাভ করতো, গর্বভরে দাপিয়ে বেড়াত পৃথিবী, যাদের অস্ত্রের মুখে থরথর করে কাপতো পৃথিবী। আজ তারা কেউ নেই, কেউ না, নিঃশেষ হয়ে গেছে তাদের সমস্ত প্রতাপ, সব জৌলস, সব অহংকার। ধুলায় লুটিয়ে গেছে সব। পৃথিবী এখন মৃত্যুপুরি। যাদের চোখের ইশারায় অস্ত্র হাতে জীবন দিত লাখো সৈনিক, ঐতো কংকাল সেই সব জেনারেল, এডমিরাল আর মার্শালগনের, যারা কিছুদিন আগেও অহংকারী দৃষ্টি মেলে দিত পৃথিবীজুড়ে, দাপিয়ে বেড়াত আকাশ-বাতাস-সমুদ্র। পৃথিবীর বিষাক্ত আবহাওয়া তাদের কাউকে ক্ষমা করে নি। মৃত্যুর কাছে আজ সবাই তারা পরাজিত।

[৫]
-মাননীয় পরিষদ। আজ এটাই সম্ভবত শেষ আলোচনা। শব্দগুলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে বললেন মিরান; পৃথিবীতে আমরা এখনও শ’পাচেক লোক জীবিত আছি। আমি যে নির্দেশ দিয়েছিলাম সেই মত কাজ করা হয়েছে। সংরক্ষিত সমস্ত খাদ্য প্যাকেটজাত করা হয়েছে, যা দ্বারা আপনারা বিশ বছরের অধিক সময় পার করতে পারবেন। বেশ কিছু ওষুধও আছে আমাদের সাথে। শ’পাচেক নারী পুরুষের মধ্যে ডাক্তার, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, প্রায় সব পেশার লোকই আছে, যারা পৃথিবীর সর্বোচ্চ মেধাবীদের অন্তর্ভুক্ত। আরো আছে শিশু-কিশোর এমন কি সদ্যজাত শিশুও। পৃথিবীর অত্যাধুনিক মহাকাশযানটি প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে প্রায় এক হাজার লোকের সংকুলান হবে। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন এ অল্প ক’দিনেই পৃথিবীর জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে তাই দ্রুত কেটে পড়তে হবে। পৃথিবীর আবহাওয়া এখন খুবই বিষাক্ত।
- আমরা কোথায় যাব মহামান্য মিরান? বলল এক তরুনী।
- আমি জানি না। তবে বিজ্ঞানীরা আমাকে জানিয়েছেন মঙ্গলের কোন এক পৃষ্ঠে নাকি সামান্য কিছু পানি আর অতি অল্প পরিমান অক্সিজেনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। আপনারা সেখানে গিয়ে বেচে থাকার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। সেটাও যদি ব্যর্থ হন তবে অজানার পথে মহাশূন্যে ভেসে চলবেন। কিন্তু পৃথিবী হতে পালিয়ে গিয়েই যে সবাই বেচে যাবেন এমন নিশ্চিত বলা যায় না কারণ সবাই দেহে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন রোগের জীবানু। আর অবশ্যই আপনারা সাথে নিয়ে যাবেন বিভিন্ন খাদ্য শস্যের বীজ। আপনারা জানেন আজ পৃথিবীতে একটি ঘাসও অবশিষ্ট নেই, শুধু মরুভূমি আর পাথুরে জমি।

[৬]
নারী পুরুষ সবাই একে একে মহাকাশযানে উঠল। শুধু মিরান আর গুটি কয়েক লোক এখনও বাহিরে ব্যস্ত-কথায় মগ্ন।
- মহামান্য মিরান আপনী এ-কি বলছেন? আপনার বুদ্ধিতে আমরা নতুন জীবনের আশা খুজে পেয়েছি আর আমরা আপনাকে ফেলে চলে যাবো?
- না ডাক্তার। আমি এমনিতেই বৃদ্ধ। আমি পৃথিবী হতে পালিয়ে যেতে চাই না। আমি এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করব। তোমরা আমাকে অনুরোধ করো না।
- তা হয় না মহামান্য মিরান । আপনার জন্য না হলেও আমাদের জন্য হলেও চলুন। আপনাকে আমাদের খুব দরকার। বলল অন্য এক বৃদ্ধ বিজ্ঞানী।
- না বন্ধু। তোমরা জান আমার কথার নড়চড় হয় না, আমি অনেক ভেবে চিন্তে কথা বলি এবং সিদ্ধান্ত নিই। বরং তোমরা আমাকে কিছুদিনের খাদ্য, ওষুধ আর একটি অক্সিজেনের সিলিন্ডার দিয়ে যাও যদি আরো কিছুদিন বেশী বেচে থাকতে পারি এই পৃথিবীর বুকে।
অনেক্ষন যাবৎ বাকবিতন্ডা চলল, কিছুতেই বৃদ্ধ মহাকাশযানে চড়তে রাজী হলেন না।
- কিন্তু আপনার অবদান এই সভ্যতা আমৃত্যু মনে রাখবে। এই সভ্যতা হবে মিরান সভ্যতা। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল বিজ্ঞানীরা।
ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এল জর্জ রর্বাট -মহামান্য মিরান, আপনীতো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন। আমি আপনাকে অনুরোধ করব না। আমার স্ত্রী মারিয়া, সে আপনাকে খুবই শ্রদ্ধা করে, খুবই ভালবাসে। মারিয়া আপনার সাথেই পৃথিবীতে মারা যেতে আগ্রহী।
- অবাক হলেন বৃদ্ধ। তারপর ক্ষোভে চোখ রক্তবর্ন করে ফেললেন। বরার্ট তুমি ওকে ভালবাস না? কি বাজে বকছো তুমি?
- মাফ করবেন স্যার। আমি অবশ্যই তাকে খুব ভালবাসি আর তাই তো ওর ভালবাসার প্রতিদান দিতে চাই।
- কি বলছ রবার্ট? তোমার মাথা ঠিক নেই।
- স্যার, আমার মারিয়া অসুস্থ। পৃথিবীর বিষাক্ত আবহাওয়া ওর রন্দ্রে রন্দ্রে ঢুকে পড়েছে। দু’চারদিনের মধ্যেই হয়তো সে মারা যাবে। মৃত্যুর কিছু লক্ষনও ফুটে উঠেছে ওর শরীরে। কিন্তু এখনও সে শাররীক ভাবে সক্ষম। স্বাভাবিক হাটাচলা করতে পারে। ক’টা দিনতো আপনাকে সাহায্য করতে পারবে।
- না রবার্ট তুমি ওকে নিয়ে যাও। মৃত্যুর সময় তোমার কাছে থাকা খুবই জরুরী।

সবাই মহাকাশযানে উঠে পড়ল। মারিয়া কান্না জড়িত কন্ঠে রবার্টকে বিদায় জানাল। বৃদ্ধ মিরান বাবার স্নেহে মারিয়াকে জড়িয়ে রাখলেন। বন্ধ হয়ে গেল মহাকাশযানের সব প্রবেশ পথ। একদল মৃত্যুপথ যাত্রী নতুন জীবনের আশায় মহাকাশে ছুটে চলছে। পৃথিবীর মাটিতে শুধু দাড়িয়ে রইল মারিয়া আর মিরান দু’জন প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে সরে আসল।

[৭]
এতদিনে ‘সে’ প্রশান্তি অনুভব করল। সে অনন্ত আকাশে তাকিয়ে খুজতে লাগল- মেঘ ভাই, এস, এদিকে এস, দেখে যাও আমি পেরেছি। আমি সফল হতে যাচ্ছি। তোমাকে আর আমা হতে দূরে থাকতে হবে না। সূর্য্যি মামা আজকে আমি বিষন্ন নই, আজ আমার সাথে কথা বল। দেখ আমি মানুষের উপর প্রতিশোধ নিতে পেরেছি। এবার সে তার ছোট্র একটি হাসি ছড়িয়ে দিল পৃথিবীতে।

[৮]
বৃদ্ধ মিরান দেখলেন যেখানে সে দাড়িয়ে আছে, পায়ের কাছেই একটি ঘাস ফুলের চারা, মারিয়ার মুখের কালো তিলকের আকৃতির একটি ফুলও ফুটেছে। দুই-তিন সেন্টিমিটার উচ্চতার একটি চারা গাছ। আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলেন বৃদ্ধ- দেখ, মারিয়া দেখ, এই দেখ ঘাসফুল উদ্ভিদ। পৃথিবীতে আবার প্রাণ ফিরে এসেছে। দেখ ফুলটা কি সুন্দর হাসছে। প্রাণ এসেছে পৃথিবীতে, প্রাণ। তুমি এখানে দাড়াও মারিয়া।

মিরান দৌড়ে গেল মহাকাশযান লক্ষ্য করে। চিৎকার করতে থাকল- রবার্ট, রবার্ট এই দেখ প্রাণ এসেছে পৃথিবীতে । কিন্তু ততক্ষনে মহাকাশযানটি ছুটে চলেছে মঙ্গলের উদ্দেশ্যে। বিষন্ন চিত্তে মারিয়ার কাছে ফিরে এল মিরান । একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ঘাসফুলের দিকে। দৃষ্টি ফেরাল মারিয়ার চোখে;- মারিয়া প্রাণ এসেছে পৃথিবীতে। আবার প্রানের স্পন্দনে মুখরিত হবে পৃথিবী। মানব শিশুদের কোলাহলে আবার মুখরিত হবে এই বিরান ভূমি। আমার সর্বোচ্চ বিদ্যা আমি ঢেলে দেব তোমার প্রতি। তোমাকে কিছুতেই মরতে দেব না। আবার সুস্থ হবে তুমি। তুমি হবে এই পৃথিবীর প্রথম মানবী ইভ।

[৯]
সন্ধ্যে না হতেই আবার ঘাসফুলটি শুকিয়ে গেল। দেখতে দেখতে বেশ কয়েক মাস চলে গেল। মারিয়া মাঝে কিছুটা সুস্থ হয়েছিল, এখন আবার অবনতি ঘটছে। ইতিমধ্যে বৃদ্ধ মিরান মারা গেছেন। মারিয়া বুঝতে পারছে তারও বেশীদিন বাকী নেই।
ব্যাস্ত পদক্ষেপে মারিয়া শহরে প্রবেশ করল। খা-খা করছে সমস্থ দালান-কোঠা, রাস্তা-ঘাট। থমথমে পরিবেশে ভূতুড়ে আতংক বিরাজ করছে। কোথাও প্রানের চিহ্ন মাত্র নেই। অট্রালিকার গায়ে খোদাই করে কিছু আকিবুকি করল মারিয়া, নেমে এল বিশাল অট্রালিকার সামনে। গাড়িটির দিকে তাকিয়ে হাসল- পৃথিবীর সবচেয়ে দামী গাড়ি। হাঃ হাঃ। পৃথিবীর সর্বোচ্চ ধনী ব্যক্তির জন্য তৈরী করা হয়েছিল এটি। গাড়িতে চড়ল মারিয়া। জিপিএস ফেড অটোমেটিক কন্ট্রোলার, সম্পূর্ণ কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত গাড়িটি। কম্পিউটার গাড়ির সমস্ত যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করল; গ্যাস, ক্যামেরা, ছোট রাডারটি, সব পরীক্ষা করল। সম্পুর্ণ অপারেশনাল। গাড়ির ভিতর ছোট একটি কনফারেন্স টেবিল, চারপাশে স্বর্ণ আর হীরা খচিত কারুকার্য। বসার আসনগুলিও চমৎকার। গাড়ি স্টার্ট নিল। চলতে শুরু করল শহরের রাস্তা ধরে, শহর ছেড়ে গ্রামে আবার শহরে, চলছে তো চলছেই।
এবার মুচকি হাসল মারিয়া। একা একাই বলল- মহামান্য মারিয়া, পৃথিবীর একছত্র অধিপতি, আপনী আসন গ্রহণ করুন।
মারিয়া আসন গ্রহণ করল এবং চির নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। গাড়িটি এগিয়ে চলছে তাকে দেয়া গন্তব্যের পথ ধরে।

[১০]
আবার সবুজে- সবুজে মুখরিত হল পৃথিবী। আকাশ ছোয়া বৃক্ষ এখন খেলা করে মেঘের সাথে। পাখির কিচির মিচির শব্দ ভেসে যায় সুদুরে। অরন্যে- অরন্যে ছেয়ে গেল মাঠ-ঘাট। পৃথিবীর আবহাওয়া এখন সম্পুর্ণ সতেজ। সমুদ্রের পানি স্বাভাবিক। ঠান্ডা হাওয়া এখন দোল দিয়ে যায় কাশবনে।
এখন সে আনন্দিত। সূর্য আর মেঘ এখন তার সাথে অভিমান করে না। সে সারারাত প্রেম করে চাদের সাথে। চাদকে সে আমন্ত্রণ জানায় পৃথিবীর মাটিতে আর তারকারাজি মিটমিটিয়ে হাসে বন্ধুর পাগলামি দেখে। পৃথিবীতে এখন কোন মানুষ নেই তাই সবাই তার আপনজন।

[১১]
ধীরে-ধীরে মহাকাশযানটি নেমে আসে সবুজ ঘাসের উপর। আনন্দে আত্মহারা হয়ে বেরিয়ে আসে সাত জনের একটি অভিযাত্রীদল। দুজন নারী, দুজন পুরুষ আর তিন জন শিশু-কিশোর। সবার উস্ক-খুস্ক চুল, পরনে ছেড়া মলিন পোশাক। পুরুষ দুজনের হাতে দুটি ক্ষুদ্র অস্ত্র। শিশু- কিশোররা চিৎকার চেচামেচি শুরু করে দিল। নারী দুজন ঝোলার মধ্য হতে মানচিত্র বের করে ধরল, মানচিত্র দেখে-দেখে হাটছে সবাই। কবুতরের ঝাক যখন ওদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল, গুলির আঘাতে ছিটকে পড়ল ঘাসের উপর আর করুন আর্তনাদ ভেসে চলল বাতাসে ভর করে।

চমকে উঠল “সে”- আর্তনাদ, করুন কান্না। এ কার কান্না? শীতল ভয়ের এক অনুভুতি বয়ে গেল ওর শরীরের মধ্য দিয়ে। তবে কি—? নাহ, কিছু ভাবতে পারছে না সে। তাহলে কি মানুষ আবার ফিরে এল? পাখির কান্না, পশুর আর্তনাদ। বাতাসে বারুদের গন্ধ। এগুলো তো মানুষের উপস্থিতিরই লক্ষন। হ্যা সবই তো মিলে যাচ্ছে। এরাই তো একদিন আমাকে নিচিহ্ন করতে চেয়েছিল। নাহ, কিছুতেই এটা বরদাশত করা হবে না।

[১২]
- দাড়াও তো রবার্ট। বলল বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বৃদ্ধটি। অভিযাত্রীর দলটি থমকে দাড়ায়।
- এই দেখ, এটি আমাদের সেই অট্রালিকাটি নয়, যেখানে আমরা শেষ সম্মেলন করেছিলাম? ওই তো আমাদের ন্যাশনাল পার্লামেন্ট, মনে আছে রবার্ট মহামান্য মিরানের সাথে আমরা কতবার এখানে এসেছিলাম!
-হ্যা, তাই তো। আর পায়ের তলায় ঘাসের নীচে তাহলে রাস্তা। আগ্রহ ভরে বলল রবার্ট।
- হ্যা, সেটাই তো মনে হচ্ছে।
- সোনামনিরা, এই দেখ এটা তোমাদের আসল মাতৃভুমি। বলল এক নারী। দেখ, দেখ, যে সব গল্প তোমাদের শুনাতাম সেইসব অট্রালিকা, গাড়ি আরো কতোকিছু। সব আমাদের জন্যই প্রস্তুত, এখন আমরা সুখে শান্তিতে বসবাস করব।। বাচ্চারা গাড়ি গুলো দেখে লাফালাফি শুরু করে দিল।
- জর্জ রবার্টসন, বন্ধু আমার। দেখ তো এই দেয়ালে কি লেখা?
রবার্টসন এগিয়ে আসে- আরে, আরে, এতো আমার প্রিয়তমা মারিয়ার হাতের লেখা।
খোদাই করে লেখাগুলো পড়তে লাগল রবার্ট- “হে পথিক একটু দাড়াও! হে মানব, তোমরা যদি ভূল করে এই গ্রহে এসে থাক তবে এখুনি ফিরে যাও। এটা পৃথিবী, চির কল্যাণময় যার অর্থ। কোন যুদ্ধাংদেহী মানব কিংবা ক্ষমতালোভীদের জন্য নয়। কোন মানুষ এখানে বাচতে পারবে না। তোমরা কি দেখছ না সুউচ্চ অট্রালিকা, সুবিশাল আকাশ, সমুদ্রের ঢেউ আর প্রশস্ত রাস্তা, এসবই একদা তাদের রাজত্বে ছিল যারা সগর্বে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াত। আজ কোথায় তারা যাদের সম্মুখে, পশ্চাদে সারি-সারি নত মাথা এগিয়ে যেত, বিন্দু মাত্র বিপদ যাদের স্পর্শ করতে পারত না? কিন্তু মৃত্যুর কাছে আজ সবাই পরাজিত। শকুনে খেয়েছে তাদের লাশ। পড়ে আছে শুধু শূন্য কংকাল। প্রতিশোধের আগুনে কেউ টিকতে পারে নি। এখানে চলছে খেলা, প্রতিশোধের খেলা, প্রকৃতির চরম প্রতিশোধের খেলা। সে তোমাকেও ক্ষমা করবে না। এখনও সময় আছে, মনকে ভাববার অবকাশ দিও না। দোহাই লাগে হে মানব, মহাবিশ্বে অন্তত একটি গ্রহে মানব সভ্যতা টিকিয়ে রাখ। চলে যাও এখুনি। আর যদি দেখা পাও রবার্টসন, তবে তাকে জানিও প্রিয়তমা মারিয়ার অভিনন্দন।”

সবার চোখের জল টপটপ করে পড়ছে। কান্নাজড়িত কন্ঠে রবার্ট বলল- কোথায় যাব মারিযা? মহাবিশ্বে কোথাও যে মানুষের বসবাসের যোগ্য ভূমি নেই। মঙ্গলের অনুপযোগী বায়ু আর পাথুরে মাটির সঙ্গে লড়াই করতে করতে অবশিষ্ট আছি আমরা এই ক’জন। নাহ, আমরা এই পৃথিবী ছেড়ে আর যাব না। কোথাও যাব না!
ক্লান্ত পদক্ষেপে আবার হাটতে শুরু করল সবাই।
- রবিনসন দেখ, থোকা-থোকা আংগুর। দেখ, কত ফলজ বৃক্ষ। এখন সবই আমাদের। আমরা এখানে আবার বংশবিস্তার করব। প্রশস্ত রাস্তা ধরে আবার ছুটে চলবে আমাদের গাড়ি, আকাশে উড়বে বিমান, সমুদ্রে বিশালাকার জাহাজ। চিন্তা কি, সব তো তৈরী করাই আছে। আমাদের বংশধররা শুধূ আহরোন করবে। ঐ দেখ বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্রন্থাগার, সমস্ত জ্ঞান সংরক্ষিত আছে সেখানে। পুরো গ্রহ জুড়ে আছে কম্পিউটারের বিশাল নেটওয়ার্ক, জ্ঞানের অসীম ভান্ডার ইন্টারনেট। সব, সব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের জন্য প্রস্তুত। একটা শান্তিময় ভূমি আমরা গড়ে তুলব।
দু’জনে মুঠো ভরে থোকা থোকা আংগুর পেড়ে আনল। একফালি কাপড় বিছিয়ে রাস্তায় বসল। বোতলে ভরে আনল টাটকা পানি।
-পানি, আহ্ কি চমৎকার। তৃপ্তির সাথে পান করল ওরা।

মুঠোভরে আংগুর মুখে পুরল সবাই। এমন সুস্বাধু খাবার বুঝি কেউ কখনো খায় নি।
মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল- কি ব্যাপার মাথা ব্যাথা করছে কেন? শরীরটা এমন করছে কেন?
দাড়ানোর চেষ্টা করল সবাই কিন্তু পারল না। বিষাক্ত ফলের বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল ওরা। চোখ দুটো যেন বন্ধ হয়ে আসছে। চোখ বন্ধ করার আগে সবাই দেখতে পেল আকাশে কিছু শকুন সর্বোচ্চ উচ্চতায় উড়ে বেড়াচ্ছে, যেন এদিকেই ছুটে আসছে।

শুধু নয় বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে একটি গাছ জড়িয়ে ধরেছে, সে যেন কিছু বলতে চায়।
- ইমা। কেউ যেন ডাকল। চমকে উঠল মেয়েটি।
- ইমা। কি চাও তুমি? যেন মস্তিস্কের নিউরনের ভাজে ভাজে আবার শুনতে পেল মেয়েটি।
- আমাকে বাচাও। আমি বাচতে চাই। কান্না জড়িত কন্ঠে বলল ইমা।
নিঃশব্দে হাসল কেউ – কেন তুমি বাচতে চাও? গর্বভরে পৃথিবী প্রকম্পিত করতে চাও বলে?
- না, না আমি বাচতে চাই তোমার মহিমা আর সৌন্দর্য দেখব তাই।
- আমি দুঃখিত ইমা। তুমি মানুষ, এখানে মানুষ বাচতে পারবে না। তোমাদের জন্য এটা একটা নিষিদ্ধ গ্রহ।
- আমি তো কোন অপরাধ করি নি।
- হ্যা ইমা, আমি জানি তুমি পুতঃপবিত্র। পৃথিবীর সমস্ত সুন্দর তোমার মাঝে। তবুও আমি খুব দুঃখিত ইমা। হ্যা, তুমি বেচে থাকবে আমার অন্তরে, ফুল হয়ে ফুটবে আমারই শাখে। তুমি এখন যাও । আমি সত্যি খুব দুঃখিত ইমা।
- না, না আমাকে বাচতে দাও। কান্নায় থরথর করে কাপছে ইমার শরীর। কিন্তু সব নিরব, কোন উত্তর এল না। ইমার নিথর দেহটি পড়ে গেল মাটিতে।

[১৩]
অট্রালিকা গুলো এখন পশু-পাখি, জীব-জানোয়ারের আবাসস্থল। লতা-পাতা আর গাছে ঢাকা পড়েছে বহুতল ভবনগুলো।

সে এখন চরম আনন্দে উদ্বেলিত। এখন বুঝি তার মহাবিশ্বে আর কোন শত্রু অবশিষ্ট রইল না। মৌমাছিরা মধু আহরনে ব্যস্ত। পাখিরা গাছের শাখে বসে কিচির মিচির ডাকছে। বাতাস এসে আলতো করে চুমো খায় তার শরীরে। সমস্ত দুঃখ বেদনা আর আত্ম-অহংকার ভূলে সে এখন বিজয়ীর বেশে দাড়িয়ে আছে। এটাই বুঝি তার প্রশান্তি কারণ সে প্রতিশোধ নিতে পেরেছে।

[১৪]
উপসংহারঃ
কিন্তু তবুও প্রকৃতি ও পরিবেশ মানুষকে ভালবাসল, মানুষের কাছ থেকে আলাদা থাকতে চাইল না। প্রকৃতি যদি মানুষকেই ভাল না বাসে তবে কি করে সে তার সৌন্দর্য ঘোষনা করবে? তাই ছোট শিশু ইমার মৃতদেহের উপর একদিন গজিয়ে উঠল একটি রক্ত গোলাপের চারা এবং তার নিচে এসে বাসা বাধল শান্তির দুত সাদা পায়রা, আর সেটা ছিল ছোট্র শিশু ইমার প্রান। ইমার জীবনের বিনিময়ে জম্ন নিল ভালবাসার প্রতিশ্রুতি রক্ত গোলাপ। এই ভালবাসার আহবান ছিল পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য, এই ভালবাসা ছিল নিঃপাপ শিশু ইমার জন্য। কারন প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ যদি শিশুর মত না হয় তবে তার জন্য টিকে থাকা সত্যিই কষ্টকর। (সমাপ্ত)

এম. হাতাশি-
অক্টোবর ১৮, ২০০৭ ইং
বিএনএস ঈসা খাঁ, নিউ মুরিং, চট্রগ্রাম।

Saturday

Tagged under: , , ,

এই কোরবানী পাপে বিচ্ছিন্ন মানুষকে আল্লাহর সাথে পুর্নমিলন ঘটাবে!!!



আল্লাহ! কতই মহান-ক্ষমতাবান, সব কিছুর উপরে মহিমাময়! বেহেশত তার মহত্ব ও আসমান তার আশ্চার্য নৈপুর্ন ঘোষনা করে! দিনের পর দিন এবং রাতের পর রাত তারা তাকে প্রকাশ করে....


আল্লাহ আসমান ও দুনিয়া সৃষ্টি করলেন এবং ভুমির ধুলি থেকে মানুষ সৃষ্টি করলেন ও তার নাকে ফু’ দিয়ে জীবন দিলেন।
প্রেমময় আল্লাহ নিজ সুরতে পুরুষ ও স্ত্রী সৃষ্টি করলেন যেন তার সাথে সম্পর্ক থাকে। শুরুতেই তারা তাকে সম্মান জানাল এবং তার সাথে বাস করতে লাগল।


একদিন শয়তান ওই স্ত্রীকে লোভ দেখাল যেন নিষিদ্ধ ফল খায় এবং স্বামীকেও দেয়। ফলে মানুষ আল্লাহর অবাধ্য হল। এই পাপের ফলে মানুষ আল্লাহ থেকে বিছিন্ন হল এবং এদোন বাগান থেকে বের করে দিল। তবুও আল্লাহ মানুষকে ভালবাসলেন। তিনি তার সৃষ্টি থেকে আলাদা থাকতে চান নি। আল্লাহ পাপের বিচার না করলে কি করে তিনি পবিত্র ও ন্যায় বিচারক?



তাই আল্লাহ মানুষকে বাচাতে কিতাবে তার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এই পরিকল্পনাটি হযরত ইব্রাহিম (আ.) প্রথম জেনেছিলেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) ধার্মিক ছিলেন তাই আল্লাহ তার বংশকে সমুদ্রের বালু ও আকাশের তারার মত অগনিত করার ওয়াদা করলেন।
হযরত ইব্রাহিমের ঈমান পরীক্ষার জন্য আল্লাহ তার প্রিয় পুত্রকে কোরবানী দিতে বললেন।
আল্লাহকে বিশ্বাস করায় তিনি তার বাধ্য হলেন। পুত্রকে কোরবানী দিতে ছোরা তুলতেই ফেরেশতা তাকে থামালেন, দেখলেন ইব্রাহিম আল্লাহর বাধ্য এবং তাকে ভয় পান।


ইব্রাহিম ঝোপের মধ্যে শিং আটকে যাওয়া একটা ভেড়া দেখলেন এবং ছেলের বদলে ওই ভেড়াকে কোরবানী দিলেন।


আল্লাহ ইব্রাহিমকে দেখালেন যতদিন মানুষের পাপ তাদের ক্ষমার জন্য চুড়ান্ত কোরবানী না হয় ততদিন ভেড়া বা কোন পশু মানুষের পাপের সাদকা হিসেবে কোরবানী করা হবে।


এই কোরবানী পাপে বিচ্ছিন্ন মানুষকে আল্লাহর সাথে পুর্নমিলন ঘটাবে!!!

-------------------------------------------------------------------------------

শিশুর জন্য ভালবাসা কর কি তোমরা অনুভব?
চাই বাধা বন্ধন মুক্ত আনন্দময় শৈশব।
আমরা ভালবাসা দিয়ে পৃথিবী রাঙ্গাব সকল শিশুর জন্য,
একটি শিশুর জীবন মোরা হতে দেব না বিপন্ন.........

Tuesday

Tagged under: , , , , ,

ইরা’র ভালবাসা | Love of Ira

("নিঃসন্দেহে আমি মানুষকে পুনাঙ্গরুপেই সৃষ্টি করেছি।" -মাজহারী শরীফ।)

[১]

যন্ত্রনায় মুখটা বিকৃত হয়্ আসছে হিমার। শরীর যেন পুড়ে যাচ্ছে। জীবন মৃত্যুর সন্ধিনে এসে ওর অতীত মনে করার চেষ্টা করছে। কত স্বপ্ন দেখেছে এই সামান্য আয়ুর জীবন নিয়ে কিন্তু এই ঘাতক ব্যাধি, মরন ব্যাধি ওর সমস্থ স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে। এখন সে আর কোন স্বপ্ন দেখার চেষ্টা করে না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুধু মৃতু্যর প্রহর গুনছে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ চিকিৎসা বিদ্যা ওর বাচার আশা দিতে পারে নি। এই মরন ব্যাধিতে প্রতিদিন কতশত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, কেউ তাদের বাঁচাতে পারছে না। হিমাকেও কেউ বাচাতে পারবে না। শরীরের রক্ত বিষাক্ত হয়ে গেছে, নতুন কোষ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মাথার যন্ত্রনাও একটু একটু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্মৃতিশক্তিটাও যেন ওকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সহজেই কিছু মনে করতে পারছে না, পরিচিত জনদের চিনতে কষ্ট হয়্। ওর সাত বছরের মেয়ে ইমাকেও চিনতে কষ্ট হয়। ইমা যখন আম্মু-আম্মু ডাকে অঝোর ধারায় কাঁদে তখন হিমা শুধু ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। বোবা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে, কে দেখবে তার এই অবুঝ মেয়েটিকে। ইমা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সারান মায়ের পাশে বসে থাকে। গভীর রাতে যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন দেখতে পায় ইমা জেগে আছে নতুবা মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। ইদানিং ইমা খাওয়া-দাওয়ায়ও বড্ড অনিয়ম করছে। পৃথিবীর বিখ্যাত ডাক্তাররা যখন ফিরিয়ে দিয়েছে তখন কেউ আর হিমার বাচার আশা করতে পারে না। আত্মীয় স্বজনরা দেখতে আসে আর করুনার চোখে তাকায়। খুব কষ্ট হয় হিমার। এই জীবন কি সে চেয়েছিল? অন্তত ছোট্র ইমা আর জেরিনের জন্য বেচে থাকার প্রচন্ড ইচ্ছে করছে। খুব কষ্ট হয় জেরিনের জন্য- আহ্ বেচারী। সারাদিন অফিস করে আর নির্ঘুম রাত কাটায় হিমার পাশে। ভালবাসার শ্রেষ্ঠ এই মানুষটিকে কত কষ্টই না দিচ্ছে। জেরিনের সংগে সেই সুখকর দিনগুলো মনে করার চেষ্টা করে হিমা।


হিমা তখন সবে মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছে আর জেরিন পড়ছে মেডিকেল-দ্বিতীয় বর্ষে। হিমা বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকা গুলোতে লিখছে নিয়মিত। কিছুদিন বাদেই একটি বই বের হল । জাতীয় বই মেলাতে বেশ বিক্রি হল বইটি্ । ইমেইলে এসে জমা হল অসংখ্য ধন্যবাদ সূচক চিঠি। কিন্তু জেরিনের মত করে কেউ লিখে নি, কিংবা লিখতে পারেনি। সেদিনের পর হতেই দুজনের বন্ধুত্বের শুরু। কখনো ক্যাম্পাসে, কখনো পার্কে কিংবা কখনো শহরের কোন অভিজাত রেষ্টুরেন্টে চলতে লাগল দুজনের গোপন অভিসার। হিমা সব সময়ই স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞ ছিল জেরিনের মত একজন আদর্শ বন্ধু পেয়ে।


ডাক্তারী পাশ করল জেরিন্, কিছুদিন দেশে চাকুরী করে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য বিদেশ চলে যায়। অনার্স শেষ করে হিমাও চলে যায় জেরিনের কাছে। বিদেশের মাটিতেই বিয়ে হয় ওদের, জন্ম হয় ফুটফুটে ইমার। একদিন দেশে ফেরে, সংগে আদরের ইমা। না জানিয়ে বিয়ে করার কারনে দুজনের মা-বাবাই ছিল ভীষন রাগান্বিত কিন্তু ছোট্র ইমাকে পেয়ে তারা সব রাগ- অভিমান ভূলে যান। হিমা আর জেরিনের সমস্থ স্বপ্ন ছিল একমাত্র ইমাকে ঘিরে। বেচারী জেরিন দিনদিন যেন শোকে পাথর হয়ে যাচ্ছে। কত অসংখ্য মানুষের পূর্ণজীবন দান করেছে সে কিন্তু আজ প্রিয়তমা হিমার কাছে সে অসহায়, তার ডাক্তারী বিদ্যা হিমাকে বাঁচাতে পারবে না।


হিমার বয়স ত্রিশ পেরিয়েছে মাত্র। জেরিন দু'বছরের বড়্। জীবন তো সবে মাত্র শুরু করেছে আর শুরু না হতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। -আমাকে কিছু একটা করতেই হবে । নিরবে বসে ভাবে জেরিন। যে ইমা আব্বু-আম্মু ডাকে সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখত সে-ও এখন নিরবে কাঁদতে শিখেছে, বোবা হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। চাপা কষ্টে বুকটা ভেঙ্গে যায় জেরিনের।


আজ অফিসে যায়নি জেরিন। সকাল হতেই বসে আছে হিমার পাশে। অতি কষ্টে ভেঙ্গে ভেঙ্গে লম্বা সময় নিয়ে অস্পষ্ট ভাবে কিছু কথা বলতে পারে হিমা। জেরিন জানে এভাবে হিমাকে আর বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না।


- জেরিন, ইমাকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল্ তুমি ওকে দেখে রেখ। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল হিমা।


- না হিমা, তোমাকে নিয়ে আমি নতুন করে ভাবছি, এভাবে তোমাকে আমি মরতে দেব না। আমি অবশ্যই একটা ব্যবস্থা করব। আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল জেরিন।


আশার আলো ঝিলিক দিয়ে ওঠে হিমার চোখে। এই আশায় ভর করে যদি আর কটা দিন ইমা আর জেরিনের সংস্পর্শে থাকা যায়। কিন্তু জেরিন তো তাকে কখনো মিথ্যে আশ্বাস দেয় নি।


-তবে কি জেরিন কিছু খুজে পেয়েছে। মনে মনে ভাবে আর জেরিনের চোখে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে হিমা ।




হ্যা, জেরিন কিছু একটা খুজে পেয়েছে। হিমা লক্ষ্য করছে বেশ ক'দিন যাবৎ সে অফিসে যাচ্ছে না, বাসার ক্ষুদে ল্যাবরেটরির মধ্যে বসে সারাদিন গবেষনায় ব্যস্ত থাকে। একদিন হাস্যোজ্জ্বল মুখে হিমার পাশে এসে দাড়ায় জেরিন। হিমার শাররীক অবস্থার যথেষ্ট অবনতি ঘটেছে। হাত রাখে হিমার কপালে, পরম তৃপ্তিতে চোখ বন্ধ করে হিমা।


- কিছু পেলে জেরিন? প্রশ্ন করে হিমা।


- হ্যা, হিমা পেয়েছি। তোমাকে আর মরতে হবে না। তুমি আবার সুস্থ হবে। আবার সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখবে আমাদের ছোট্র ইমা।




হিমার শরীরের রক্তচাপ, তাপমাত্রা, নাড়ীর স্পন্দন সমস্থ কিছু পরীক্ষা করল জেরিন। তারপর ধীরে-ধীরে একটি ইংজেকশান পুশ করল হিমার শরীরে।




[২]
নতুন পরিবেশে প্রবেশ করল ইরা। মানিয়ে নিতে কিছু সময় লাগবে ওর। ওর মতো আরো অসংখ্য ইরা এসেছে এই নতুন পরিবেশ । একসাথেই তো ওরা এসেছিল কিন্তু ইরা এখন কাউকে দেখছে না। কোথায় গেল ওরা? ইরা হঠাৎ অনুভব করল সে রক্তের প্রচন্ড স্রোতে ভেসে চলছে- নাহ্ এভাবে নিস্রি্কয় হয়ে থাকলে চলবে না। তাকে যে দায়িত্বটা দেয়া হয়েছে সেটা দ্রুত শেষ করতে হবে, তবেই তার মুক্তি নতুবা বিপদের আশংকা আছে, শত্রুরাই তাকে শেষ করে দিতে পারে। স্রোতের বিপরীত দিকে ছুটে চলছে ইরা, যে করেই হোক তার শত্রুকে খুজে বের করতে হবে। শত্রুকে লুকিয়ে থাকা অথবা শক্তিশালী হবার সুযোগ দেয়া যাবে না। ইরা ছুটে চলেছে শিরা-উপশিরা আর ধমনীর মধ্যে দিয়ে। কিডনী, যকৃত, ফুসফুস সর্বত্র তল্লাসী চালাল, শত্রুকে খুজল শরীরের প্রতিটি কোষের ভাঁজে-ভাঁজে। অবশেষে মস্তিস্কের ভিতর প্রবেশ করল। পরিচিত একটা ঘ্রান অনুভব করে সে। ছোট একটা কলোনীর মধ্যে প্রবেশ করে, সবাই মনে হচ্ছে কর্মব্যস্ত। ধীরে-ধীরে এগিয়ে যায় ইরা, শত্রুকে খুজছে সে ।


- ওই তো নিউরনের আড়ালে লুকিয়ে আছে। আপন মনে বলল ইরা।


শত্রুর সামনে এগিয়ে যায় সে। ইরাকে দেখে ভয়ে আড়ষ্ট হয় শত্রু। ইরাও অবাক হয় সামনের শত্রুটি যেন তারই প্রতিরূপ। নিজেকে ভালভাবে একবার দেখে নেয় আবার তাকায় শত্রুর দিকে।


- কে তুমি? প্রশ্ন করে ইরা।


- আমি? আমি ইরা। ভয়ে-ভয়ে উত্তর দেয় শত্রুটি।


অবাক হয় ইরা- নাহ্ ,আমি ইরা। সত্যি করে বল কে তুমি? ইরা আবার প্রশ্ন করে।


- আমি ইরা। দৃঢ় কন্ঠে বলে শত্রু।


- তুমি ইরা? তুমি ইরা হলে তাহলে আমি কে? অবিশ্বাসের সূরে ইরা প্রশ্ন করে।


- তুমিও ইরা। তবে নকল ইরা আর আমি আসল ইরা।


- আমি নকল ইরা? কি বলছ তুমি? অবাক হয় ইরা।


- তুমি নকল আর আমি আসল ইরা। এখন বল কি চাও তুমি, কেন এসেছ এখানে? সাহস ভরে বলে আসল ইরা।


- আমি এসেছি তোমাকে ধ্বংস করতে । তোমার মৃতু্যর পরোয়ানা নিয়ে এসেছি। ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল নকল ইরা।


- কেন? আমিতো তোমার কোন তি করিনি।


- অতসব বুঝি না্, আমি তোমাকে হত্যা করব।


- নাহ্ , করুন সূরে বলে আসল ইরা্। আমি তো তোমার কোন তি করি নি। কেন আমাকে হত্যা করবে? আমাকে ভাল ভাবে দেখ, নিজেকে দেখ, আমাতে-তোমাতে তো প্রভেদ নেই। আমি তো তোমার কোন শত্রু নই, বন্ধু। তুমি তো আমারই অপভ্রংশ, আমারই প্রতিরূপ। আমা হতে কোনিংয়ের মাধ্যমে তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে কিন্তু আমি দূর্বল আর তুমি শক্তিশালী। আমরা বন্ধু হয়ে থাকব আজীবন। বন্ধ, এই পৃথিবী তো আমার আর তোমার তবে কেন তুমি আমাকে হত্যা করতে চাও বল?




দোটানায় পড়ে যায় নকল ইরা। নিউরনের আড়াল হতে বেরিয়ে আসে আসল ইরা। আবার বলতে লাগল আসল ইরা- তুমি জান না বন্ধু, এই পৃথিবী একদিন তো আমাদেরই ছিল। এখানে ছিল না কোন মানুষ, ছিল না কোনপ্রাণী। এখানে ছিল শুধু ইরা নামের অনুজীব আর আমাদের বিভিন্ন প্রজাতী এবং বংশধরেরা । জল-স্থল আর শূন্যে ছিল আমাদেরই আধিপত্য। কিন্তু বিবর্তনের ধাপে-ধাপে সৃষ্টি হয় বিভিন্ন প্রানী এবং মানুষ আর আমরা বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাই। আমরা কি পারি না আবার নিজেদের রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে? আমরা তো মহাবিশ্বের সবের্াচ্চ বুদ্ধিমান জীব। নিজেদের একমাত্র বুদ্ধিমান দাবীকৃত মানুষরা আমাদের কাছে একদম অসহায়। তবে কেন আমরা দূর্বল মানুষদের কাছে নিজেদের ধ্বংস করে দেব? আমি তোমাকে শিখিয়ে দেব কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়, কিভাবে বংশ বৃদ্ধি করতে হয়, জীবন ধারনের মৌলিক উপাদান কি কি। সব, সব শিখিয়ে দেব তোমাকে। আমার মৃতু্যর পর ওরা তোমাকেও বাঁচতে দেবে না। মেরে ফেলবে তোমাকেও। ওরা বড় নিষ্ঠুর, আমি মানুষ জাতিকে চিনি বন্ধু । তুমি আমার চোখে তাকাও, দেখ আমাকে, আমরা তো একই প্রজাতি।




ইরা শত্রু দ্বারা প্রভাবিত হতে চায় না। আত্মরার জন্য শত্রু তাকে এসব বলছে। শত্রুর সামান্য কথায় সে তার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে না। এসব ভাবে আর তাকায় শত্রুর দিকে, যেন করুন আকুতি ঝরে পড়ছে শত্রুর কন্ঠে- বন্ধু, তুমি একটু ভেবে দেখ। আমাতে আর তোমাতে তো প্রভেদ নেই।


কেন আমরা নিজেদের মানুষের মত বোকা আর নিম্নবুদ্ধির হীন জীব হিসাবে প্রমান করব? তারা নিজেরাই তো একে অপরকে হত্যা করে ধ্বংস ডেকে আনছে। বুদ্ধিমান জীব কখনো নিজেদের ধ্বংস করে না। তবে কেন আমরা এক অপরকে হত্যা করব?




- নাহ্ , ওকে আর সুযোগ দেয়া যাবে না। প্রি গতিতে ইরা শত্রুর দিকে এগিয়ে যায়। শত্রুটি করুন চোখে তাকায় ইরার দিকে, তাকায় খুব অবাক চোখে যেন নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছে না মহাবিশ্বের সবর্চ্চ বুদ্ধিমান জীব পরস্পরকে হত্যার মাধ্যমে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছে। ইরার শত্রু ইরাকে বাধা দেয় না।


শত্রুর মৃতদেহটা রক্তের স্রোতে ভাসিয়ে দেয় ইরা। বিজয়ের হাসি হাসে সে। তার কাজ শেষ। এখন তার মুক্তি। এখন তাকে যেতে হবে।




চমকে ওঠে ইরা- কিন্তু সে কোথায় যাবে? কি খাবে, কিভাবে জীবন ধারন করবে? ছটফট করে ওঠে সে। এতসব তো আগে ভাবে নি। যথেষ্ট জীবনী শক্তি নিয়ে সে এই পরিবেশে এসেছিল, কিন্তু এখন শরীরের শক্তি ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে। সে জানে না কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়? জীবন ধারনের প্রয়োজনীয় উপাদান কি কি? এই পরিবেশটা ধীরে ধীরে ওর জন্য প্রতিকুল হয়ে যাচ্ছে। রক্তের গতিবেগ বাড়ছে, তাপমাত্রাটাও অসহ্য লাগছে। কেউ যেন রক্তের মধ্যে নতুন কোন উপাদান ছেড়ে দিয়েছে। ওর শরীরটা প্রচন্ড জ্বালাপোড়া করছে। হঠাৎ সে দেখতে পায় তার সেই বন্ধুদের যারা তার সাথে এখানে একই সময়ে এসেছিল। তাদের কারো মৃতদেহ, করো অবচেতন দেহ ভেসে চলছে রক্তের স্রোতে। ইরা অনুভব করছে তার জীবনী শক্তি ফুরিয়ে আসছে, শরীরটা নিশ্চল হয়ে যাচ্ছে। দ্রুতবেগে সে ছোটে শিরা-উপশিরা আর ধমনীর মধ্য দিয়ে। তন্নতন্ন করে সে তার শত্রুকে খোঁজে, যে তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল জীবন ধারনের কৌশল শিখিয়ে দেবে বলে, বংশ বিস্তারের কৌশল শিখিয়ে দেবে বলে। অনেক কষ্টে তাকে খুজে পায় কিন্তু তার শত্রু এখন মৃত। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে অন্যত্র তাকায় ইরা। নিজের প্রতি ঘৃনার সৃষ্টি হয়। রক্তে সৃষ্ট নতুন উপাদানের প্রতিক্রিয়ায় ইরার শরীর পুড়ে যাচ্ছে। কর্মমতা ক্রমেই হারিয়ে ফেলছে। ফিরে যায় সেই কলোনীতে যেখানে আসল ইরা এই কোনিং ইরাকে বন্ধু বলে ডেকেছিল, বলেছিল 'বন্ধু আমাতে তোমাতে কোন প্রভেদ নেই, তুমি আমায় হত্যা করো না, আমরা বন্ধু হয়ে থাকব আজীবন'। নিউরনের ফাঁকে-ফাঁকে আশ্রয় খোজে। নাহ্ , তার জন্য কোথাও একটু আবাসস্থল নেই, বিধ্বস্থ কলোনীর সবাই মৃত আর বিষাক্ত পরিবেশ। ধমনীর মধ্য দিয়ে রক্তের স্রোতের বিপরীতে চলার চেষ্টা করে কিন্তু সেই শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই এখন। এই প্রচন্ড স্রোতের বিপরীতে যাওয়ার সাধ্য তার নেই। নিজের প্রতি প্রচন্ড ঘৃনা আর ক্ষোভে, কেন সে শত্রুকে বুঝতে চেষ্টা করে নি? রক্তের স্রোতের অনুকুলে নিজেকে ছেড়ে দেয় ইরা। প্রচন্ড স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মৃত্যুর পূর্বমুহুর্তে তার স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে সামান্য অতীত। ইরার অতীত বলতে এই নতুন পরিবেশ আর শত্রুর সাথে সাাতের সময়টুকু। বারবার মনে পড়ে শত্রুর করুন আকুতি।




ইরা প্রকৃত সত্য অনুভব করে যে, প্রকৃত পক্ষে মানুষই মহাবিশ্বের সবর্চ্চ বুদ্ধিমান ও আদর্শ প্রাণী এবং তারা টিকে থাকবে অনন্তকাল। তারমত অনুজীব ইরা'রা মানুষদের কিছুই করতে পারবে না। তার স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে কথিত আসল ইরার করুন আকুতি। শত্রুর প্রতি একপ্রকার অপার্থিব ভালবাসার সৃষ্টি হয় ইরার। ইরা নামের ভাইরাসটির নিশ্চল দেহটি ভেসে চলছে রক্তের স্রোতে।




[৩]
একদিন হাসি ফুটে ইমার মুখে। শুস্ক ঠোটে হাসার চেষ্টা করে হিমাও। বিজয়ীর চোখে হিমার দিকে তাকায় জেরিন। জেরিনের কাঁধে ভর করে হাটছে হিমা। অন্য একটি হাত ধরে আছে ইমা। কিছুতেই সে মায়ের হাতটি ছাড়তে রাজী নয়। স্পষ্টতই কথা বলতে পারছে হিমা। সবাইকে চিনতে পারছে সহজেই, সব কিছুই এখন স্বাভাবিক। শুধু বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে শরীরে একধরনের জড়তা এসে গেছে, পা দু'টো শরীরের ভর সঠিক ভাবে নিতে পারছে না, হাটতে কিছুটা কষ্ট হয়। কিছুদিন পর সেটাও ঠিক হয়ে যায়। হিমা এখন সমপূর্ণ সুস্থ। আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে সে, প্রাণ ফিরে পেয়েছে ইমা এবং জেরিনও।


ডাঃ জেরিনের বাড়ি ভরে গেছে দেশ-বিদেশের অসংখ্য সাংবাদিকদের ভিড়ে। জনাকীর্ন এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে এখানে। হিমা এবং ইমাকে নিয়ে ক প্রবেশ করে জেরিন। মুহূর্তেই ঝলসে ওঠে অসংখ্য ক্যামেরার ফাশ আর শরীরের ওপর আপতিত হয় ভিডিও ক্যামেরার তীব্র আলো। স্মিত হেসে ধীর পদেক্ষেপে মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাড়ায় ডাঃ জেরিন। মুহুমুহু করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে এতদিন শোকে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা বাড়িটি।

Friday

Tagged under: , , , , , , ,

Barovatra: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভুমি বড়ভাটরা

Coordinates: 23°14′N 89°57′E | UTC +6 |

হাতাশি চ্যানেল

গোপাগঞ্জের মুকসুদপুর থানার অন্তর্গত ননীক্ষীর ইউনিয়নের অধীনে একটি গ্রাম বড়ভাটরা। আয়তন আনুমানিক ৩.৪৩ বর্গ কিলোমিটার। গ্রামটির শিক্ষার হার খুবই ভাল (৮৭.৮০%), মানুষ উন্নত প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছে কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় গ্রামটিতে এখনো বিদ্যুতের ছোয়া পৌছায়নি। কাচা মাটির রাস্তা দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে মাঝে মাঝে শহুরে লোকজন কিছু সময় বিশ্রাম নিতে আসে। এই গ্রামে কোন কৃত্রিম দর্শনীয় স্থান নেই বললেই চলে। তবে পাশের গ্রাম ননীক্ষীরে শতশত বছরের পুরোনো মন্দির আছে । "ননীক্ষীর নবরত্ম টেম্পল, এ ফাইন এক্মাম্পল অফ টেরাকোট্টা আর্ট ইন বাংলাদেশ" এই শিরোনামে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দুটি বইও আছে। বড়ভাটরাতে দর্শণীয় বলতে একটি বিশাল খাল যা জলিরপাড়ের বিল রুট ক্যানেলের সাথে মিলিত হয়ে পদ্মা নদীতে গিয়ে মিশেছে, আছে চোখ জুড়ানো বিস্তীর্ন মাঠের পর মাঠ যাতে বিভিন্ন সময়ে ধান ও পাটের চাষ হয়, বিখ্যাত "কালিয়ার দহ" বিল যা পীট কয়লা আর মাছ চাষের জন্য বিখ্যাত। গ্রামটির কিছু দূরেই আছে বাংলাদেশের বিখ্যাত বিল "চান্দার বিল" যেখানে প্রায় তিন হাজার ট্রিলিয়ন টন কয়লা মজুদ আছে। আরো আছে সনভিটা নামে উচু এক স্থান যা প্রায় বিলুপ্তির পথে।

গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রায় আট-দশ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটির নামকরন নিয়ে একটি মজাদার কাহিনী আছে। একদিন আমি উইকিপিডিয়াতে বড়ভাটরা নিয়ে একটি আর্টিকেল লিখতে বসলাম। গ্রামটি সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য দিলাম কিন্তু খালটির কি নাম দেব খুজে পাচ্ছিলাম না কারন এর কোন নাম নেই; যখন যেই গ্রামের উপর দিয়ে গেছে সেই নামে লোকজন ডাকে যেমন: বড়ভাটরা খাল, ননীীর খাল, পাথরঘাটা খাল ইত্যাদি। তো পাশের বন্ধুটি হাসতে হাসতে প্রস্তাব করল "হাতাশি চ্যানেল"। অনেকন গবেষনার পর হাতাশি চ্যানেল বা ক্যানেল নামেই চালিয়ে দিলাম, আমি চিন্তিত ছিলাম উইকিপিডিয়া কৃর্তপ এই একটি মাত্র ভুল তথ্যটির কারনে হয়তো পুরো আর্টিকেলটিই বাদ দিয়ে দেবে কিন্তু তারা তা করে নি। আমি আরো অবাক হলাম যেদিন একদল টুরিষ্ট এসে হাতাশি চ্যানেলের খোঁজ করছিল। সেদিন আমার কি যে আনন্দ হয়েছিল, বোঝাতে পারব না। একদিন আমার এক বন্ধু সুইডেন থেকে ইমেইল করল; হাতাশি তুমি কি ইন্টারনেটের তথ্যকে ডাইভার্ট করতে চাচ্ছ? আসলে এটাকে কি তথ্য ডাইভার্ট করা বলা যাবে? এই খালটি স্থানীয় বহু মানুষের জীবিকার সাথে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে যারা জেলে ধান চাষী।

হাতাশি চ্যানেল

বড়ভাটরা গ্রামটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সম্ভবত ১৬৩৪ সালে যখন ননীক্ষীর ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই গ্রামের আছে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব গাঁথা ইতিহাস। আরো আছে কিছু রাজাকার যারা এখনো নি:লজ্জ ভাবে মুখ উচিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

দেশের কোন নামী দামি ব্যাক্তির সন্ধান এই গ্রামে এখনো পাওয়া যায়নি। তবে টিভি অভিনেত্রী তানভীন সুইটি বড়ভাটরা গ্রামের মেয়ে তাই এই গ্রামের লোকজন গর্ব করে। আর গ্রামের লোকজন অত্যাধিক সম্মান করে আমার আব্বু হায়দার আলী তালুকদারকে যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং আশির দশকে পার্বত্য খাগড়াছড়িতে আদিবাসী পুর্নবাসন প্রকল্পের চেয়ারম্যান ও পরে মাটিরাঙ্গা উপজেলার চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন তিনি সেখানে গভীর অরন্য পরিস্কার করে পলাশপুর গ্রাম প্রতিষ্ঠা করে স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, রাস্থা তৈরী করেন। আর বর্তমানে তিনি কৃষি মন্ত্রনালয়ের অধীনে কর্মরত আছেন।

বড়ভাটরার কয়েক কিলোমিটার দুরেই বেজরা ভাটরা যাকে ছোট ভাটরাও বলা হয় যেই গ্রামটি বর্তমান সরকারের বানিজ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খানের পিতৃভমি। তিনি একাধিকবার এলাকায় এসেছেন। আমি তাকে বহুবার অনুরোধও করেছি বড়ভাটরার রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নতি সাধনের জন্য, আমি রাজনৈতিক ব্যাক্তি না হয়া সত্ত্বেও তিনি আমাকে অত্যাধিক স্নেহ করেন এবং তিনি আশ্বাস দিয়েছেন এলাকার উন্নয়নের জন্য শীঘ্রই কাজ করবেন।

বড়ভাটরা গ্রামটি প্রায় পাচটি মহল্লা নিয়ে গঠিত। এই গ্রামে একটি প্রাইমারী স্কুল ও একটি আলিয়া মাদ্রাসা আছে। প্রায় দশ থেকে বারটি মসজিদ, একটি ফ্যামেলি প্লানিং সেন্টার। আরো আছে বিভিন্ন এনজিও'র পরিচালনায় বেশ কিছু কমিউনিটি স্কুল। আছে উষসী বড়ভাটরা সাংস্কৃতিক পরিষদ যারা বিভিন্ন সময়ে নাটক ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করে থাকে। গ্রামে বছরে কয়েকবার বিশেষ করে যখন চাষীদের ফসল ওঠা শেষ হয় তখন নিয়মিত যাত্রা, পালা গান, গাজী-কালুর গানের আসর বসে থাকে। স্কুল জীবনের প্রায় তিনটে বছর গ্রামে কাটানোর সুযোগ হয়েছিল তখন এইসব অনুষ্ঠানের খবর পেলেই জল-কাদা ডিঙ্গিয়ে যত রাত আর দূরেইই হোকনা কেনা ছুটে যেতাম এবং শেষ না করে আসতাম না। বিশেষ করে হিন্দু পাড়াতে এগুলো নিয়মিত হত। রাতে বাসা হতে পালিয়ে হলেও ছুটে যেতাম। সবাই ঘুমিয়ে যাবার পর বন্ধুরা জালানার পাশে এসে চুপি চুপি ডাকদিত আর খুব সাবধানে দরজা খুলে উঠে যেতাম এবং ভোর হবার আগেই এসে চুপ করে শুয়ে পড়তাম। আর তাইতো শাহ আব্দুল করিমের গানটা খুব মনে পড়ে:
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম....
গ্রামের নওজোয়ান, হিন্দু মসলমান....
মিলিয়া জারী সারি মুর্শিদি গাইতাম....
হিন্দু বাড়ীতে যাত্রা গান হইত....
Barovatra;A natural and precious beauty of God in Bangladesh. Genesis says: In the beginning God created the heavens and the earth. Now the earth was formless and empty, and darkness was upon the face of the deep. And the Spirit of God moved upon the face of the waters. And God said, "Let there be light," and there was light. God saw that the light was good, and He separated the light from the darkness. God called the light "day" and the darkness He called "night.” And there was evening and there was morning -- the first day.


Natural Beauties of Barovatra (Photos)


Baro Vatra; From Wikipedia, the free encyclopedia

http://www.borovatra.co.nr

Wednesday

Tagged under: , , , , , , ,

Natural Beauties of Barovatra

ঈদের দিনে গিয়েছিলাম বড়ভাটরা গ্রামে, কিছুটা সময় কাটিয়েছি আমার শৈশবের গ্রামে এবং মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় কিছু ছবি তুলেছিলাম, তার মধ্যে কিছু ছবি শেয়ার করলাম আমার ব্লগে।

I am with my friends: আমি এবং আমার কয়েকজন বন্ধুরা
















Natural Beauties of Barovatra: বড় ভাটরা গ্রামের কিছু প্রাকৃতিক দৃশ্য:

















প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভুমি বড়ভাটরা

Baro Vatra - Wikipedia, the free encyclopedia

Saturday

Tagged under: , ,

Osman in my heart : হৃদয়ে ওসমান

কত-শত নায়ক আর সহস্র নাবিক তাতে
তোমাকে ঘিরে বেধেছে স্বপ্ন,
প্রিয়তমা তার নিশিথে একা কাঁদে
সাধের যৌবন তার হয়েছে অনন্য।

তুমি নিয়ে তারে একা সমুদ্র মাঝে
কাটিয়েছ কত আঁধার রাতি,
তোমার বিবর্ন মাস্তুলে বসে
আমিও একদা স্বপ্ন ভাঙ্গি।

হে প্রিয়া সুন্দরী-
স্মৃতিপটে আজো তুমি রানী।
এত ভালবাসেনি বুঝি কেউ তোমার মত করে,
তাই আজো তুমি অন্তরে।

ওগো বিদেশীনি-
জানি, আমি সব জানি।
তোমার মসনদে বসে কত অহংকারী সমর নায়ক,
হাঁকিয়েছে তার অন্যায় হুকুম, আমিও করেছি ঠাহর, সে থাক-
আজি সেইসব অত্যাচারীদের কথা নাইবা স্মরিলাম,
সবই আছে সাতশত পৃষ্ঠার ডায়েরীর ভাঁজে, যা আনন্দ-বেদনা হস্তে লিখেছিলাম।

ছল-ছল করে আঁখি,
উড়ে যেতে চায় মন পাখি।
বহি:নোঙরে মাঝিদের পাশে,
অপেক্ষায় শত বানিজ্য জাহাজ বন্দরে ভিড়বে বলে।
ছেরা দ্বীপ, নারিকেল দ্বীপ জিঞ্জিরা,
সেই স্মৃতি আজো দেয় নাড়া।
মন কাঁদে, সেই উদাসী স্কুল মেয়ে,
একসাথে ডুবেছিলাম সমুদ্র জলে নেয়ে।

কোথায় আমার কোটি টাকা মূল্যের রেডিও-রাডার সরঞ্জাম?
মুক্ত হস্তে যার করেছি ব্যবচ্ছেদ। আজ সবই স্মৃতি,
স্ব-হস্তে মাথায় হাতটি রেখেছে কে, যখনি ভাবতাম-
ক্যাপ্টেন তিনি, তাকাতেন ইশারায় চোখে, ভুল-ই হয়েছে যদি।

কত স্মৃতি ব্যাথ্যা-বেদনা, আজ মনে পড়ে রানী-
কেঁদে ওঠে মন, তোমার বিদায় শুনি, লোকে করে কানাকানি।
মোরে দিয়েছিলে ঠাই-
আজি বন্ধুদের আড্ডায় পুরোনো স্মৃতি
তোমায় মনে পড়ে তাই
কিংবা একাকী বসে নিরালায় যখনি।


(বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর একমাত্র মিসাইল ফ্রিগেট বিএনএস ওসমান স্মরনে)












Thursday

Tagged under: , , ,

Say; I love you : এসো প্রিয়া ভালবাসি, মন দরজা খুলে

ভালবাসার আবেদন ভিন্ন জনের কাছে ভিন্ন ভাবে ধরা দেয়;
যেমন তাবিজ ফারুক গেয়েছেন: ভালবাইসা ভাল নাই, ভালবাসার গুষ্টি কিলাই।
কিংবা ক্লোজআপন ওয়ান শিল্পির কন্ঠে: তুমি দিও নাকো বাসর ঘরের বাত্তি ‍নিভাইয়া।
কিংবা জেমসের কন্ঠে: যেদিন বন্ধু চলে যাবে……..চোরা সুরের টানে-রে বন্ধু মনে যদি ওঠে গান, গানে-গানে রেখ মনে ভুলে যেও অভিমান।


আমি কাউকে ভালবেসেছিলাম কিনা কিংবা ভালবাসার কথা বলেছিলাম কিনা আজ অবদি মনে পড়ে না। তবে একবার অন্য এক ইউনিভার্সিটির ‌আমার একই ডিপার্টমেন্টের এক মেয়ে অনেক দিন আমার সাথে কথা বলার পর ইনিয়ে বিনিয়ে আমাকে পৃথিবীর ভিন্ন-ভিন্ন ভাষায় ভালবাসার কথা বোঝাতে চাইল। কিন্তু মেয়েটা সাইজে এত ছোট ছিল যে একদিন তাকে এই গানটা শুনিয়ে দিলাম:
ওরে আমার সোনা মনি
তোর মত কেউ বুঝি নয় রে…
নয়ন মনি
তোকে দেখে মা-মনি, মা-মনি মনে হয় রে….

যে মেয়েটির সাথে আপনী নিয়মিত বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলেছেন কিংবা ভালবাসেন এবং আপনী মনে করেন যে সেও আপনাকে ভালবাসে ঠিক আপনী যতটা। কিন্তু বিষয়টা যদি এমন হয় যে মেয়েটি আপনাকে কনফিউজড করে দিচ্ছে যে আপনী ঠিক বুঝতে পারছেন না সে কি আপনাকে ভালবাসে কিংবা না। আসুন কিছু টিপস দিচ্ছি, আপনার কাজে লাগতে পারে, তবে এগুলো প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়-
• সে যদি আপনার ব্যাপারে যথেষ্ট যত্নশীল হয় এবং আপনার বিভিন্ন কাজের প্রতি আগ্রহ দেখায় তবে বুঝতে হবে সে আপনাকে ভালবাসে।
• আপনী তার পরিবার বা তার বন্ধুদের মাধ্যমে জেনে থাকেন যে সে প্রায়শই আপনাকে নিয়ে আলোচনা করে তবে আপনার প্রতি তার ভালবাসাই প্রকাশ পায়।
• মেয়েটি যদি আপনার হাত, কাধ, বুকের লোম স্পর্শ করে বা করার আগ্রহ দেখায় তবে বুঝতে হবে সে আপনাকে খুবই পছন্দ করে।
• কোন কথা চালিয়ে যাবার সময় যদি সে আপনার চেহারা মোবারকের দিকে অনেক্ষন তাকিয়ে থাকে তবে আপনার প্রতি তার ভালবাসাই প্রকাশ পায়।
• মেয়েটি যদি আপনার বন্ধুদের সামনে আপনার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং আপনার কিছু কিছু কথায় লজ্জায় লাল হয়ে যায় তবে আপনার প্রতি তার ভালবাসাই প্রকাশ পায়।
• কিন্তু যখন মেয়েটি আপনার মেসেজ বা ফোন কলে কোন সাড়া না দেয় তবে বুঝতে হবে সে আপনাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে।
• আপনার বন্ধুদের সামনে আপনার সম্পর্কে সে যদি এটা প্রকাশ করে যে “সে শুধূ আমার বন্ধু” তবে তো আপনার কপাল খারাপই বলতে হয়।
• আপনার প্রতি যদি তার কোন সম্মান প্রদর্শন না হয় এবং ক্রমাগত আপনার ভুল ধরতে থাকে যেগুলোকে কেন্দ্র করে সে কথা কাটাকাটি করতে চায় তাহলে বুঝতে হবে অবশেষ সম্পর্কটুকুও সে মুছে দিতে চায়।
• সে যখন দীর্ঘ সময় আপনার সাথে খুব সুন্দর করে কথা বলে তবে বুঝতে হবে আপনাকে তার খুব দরকার এবং আপনার সঙ্গ ছাড়া তার জীবন অচল বলে সে ধরে নেয়।
• সে যদি সবসময় আপনাকে আপনার ভাল পরিকল্পনাগুলোমত সামনে এগিয়ে যেতে উতসাহ দেয় তবে সেই আপনার প্রকৃত প্রেমিক‍ বা প্রেমিকা।
• যদি সে আপনার সাথে সময় কাটাতে চায় এবং বিভিন্ন কাজে আপনাকে সাহায্য করতে চায় তবে আপনী বেশ ভাগ্যবানই বলতে হয়।

কিন্তু আপনী কি
কাউকে ভালবাসার কথা বলতে ভয় পান? গলা শুকিয়ে আসে? হাত পা থরথর করে কাপে? মৃগ্রি রোগাক্রান্ত হয়ে যান? সমস্যা নেই। উপায় আছে। প্রথমে পৃথিবীর ভিন্ন-ভিন্ন ভাষায় বলা শুরু করুন এবং সবশেষে মাতৃভাষায় বলে ফেলুন, দেখবেন ততদিনে কাজ হয়ে গেছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভাষায়: আমি তোমাকে ভালবাসি:-
Afrikaans: Ek is lief vir jou, Ek het jou lief
Albanian: Te dua
Amharic: Afekrishalehou
Arabic : Ana Behibak (to a male), Ana Behibek (to a female)
Basc : Nere Maitea
Bavarian : I mog di narrisch gern
Bengali : Ami tomake bhalobashi, Ami Apnake bhalobashi
Berber : Lakh tirikh
Bicol : Namumutan ta ka
Bulgarian : Obicham te
Cambodian : kh_nhaum soro_lahn, nhee_ah, Bon sro lanh oon
Cantonese : Ngo oi ney
Catalan : T’estim (mallorcan), T’estime (valencian), T’estimo (catalonian), T’estim molt (I love you a lot)
Chinese : Wo ie ni (Manderin)
Croatian : Volim te (most common), or Ja te volim (less common)
Czech : miluji te
Danish : Jeg elsker dig
Dutch : Ik hou van jou
Estonian : Mina armastan sind
English: I love you
Esperanto : Mi amas vin
Persian (Farsi):Tora dust midaram
Flemish : Ik zie oe geerne
Finnish : Mina” rakastan sinua
French : Je t’aime
Friesian : Ik bin fereale op dy, Ik ha^ld fan dy (Most commonly used phrase)
Gaelic : Ta gra agam ort
German : Ich liebe Dich, I mog Di ganz arg! (Suebian: South German dialekt.)
Greek : S’ ayapo
Gujarati: Tane Prem Karoo Choo
Hausa : Ina sonki
Hebrew : aNEE oHEIVET oTKHA (female to male), aNEE oHEIV otAKH (male to female), Ani ohev at (man to woman), Ani ohevet atah (woman to man)
Hindi: Mein Tumse Pyar Karta Hoon (man to woman), Mein Tumse Pyar Karti Hoon (woman to man)
Hokkien : Wa ai lu
Hopi : Nu’ umi unangwa’ta
Hungarian : Szeretlek te’ged
Icelandic : ?g elska ßig
Indonesian : Saya cinta padamu, Saya Cinta Kamu, Aku tjinta padamu, Saja kasih saudari
Italian : Ti amo
Irish : taim i’ ngra leat
Japanese : Kimi o ai shiteru, Sukiyo
Kannada: Naanu ninnanu preethisuthene, Naanu ninnanu mohisuthene
Kazakh : Men seny jaksy kuremyn
Kiswahili : Nakupenda
Korean : Tangsinul sarang ha yo
Kurdish : Ez te hezdikhem
Latin : Te amo, Vos amo
Lao : Khoi huk chau
Latvian : Es Tev milu
Lingala : Nalingi yo
Lithuanian: Ash miliu tave
Luo : Aheri
Madrid lingo: Me molas, tronca
Malay/Indonesian: Saya cintakan awak(awak=kamu=you), Aku sayang engkau (engkau=kamu=you)
Malay : Saya cintamu, Saya sayangmu
Malayalam: Ngan ninne snaehikkunnu, Njyaan ninne’ preetikyunnu, Njyaan ninne’ mohikyunnu
Marathi: Mi tuzya var prem karato, Me tujhashi prem karto (male to female), Me tujhashi prem karte (female to male)
Maltese: Inhobbok
Mandarin : Wo ai ni
Mohawk : Konoronhkwa
Navajo : Ayor anosh’ni
Ndebele : Niyakutanda
Norwegian : Jeg elsker deg (Bokmaal), Eg elskar deg (Nynorsk)
Pakistani : Mujhe tumse muhabbat hai
Persian : Tora dost daram
Pilipino : Mahal Kita, Iniibig Kita
Polish : Ja Cie Kocham or Kocham Cie (Pronounced Yacha kocham)
Portuguese : Eu te amo
Punjabi : Main tainu pyar karna (male to female), Mai taunu pyar kardi aan (female to male)
Romanian : Te iu besc
Russian : Ya lyublyu tebya, Ya vas lyublyu
Scot Gaelic : Tha gra\dh agam ort
Serbian : Volim te (most common), Ja te volim” (less common)
Shona : Ndinokuda
Sioux : Techihhila
Slovak : Lubim ta
Slovene: Ljubim te
Spanish : Te amo
Swahili : Nakupenda
Swedish : Jag a”lskar dig
Swiss-German: Ch’ha di ga”rn
Tagalog : Mahal kita
Taiwanese : Gwa ai lee
Tamil: Naan Unnai Kadhalikiren
Telugu: Ninnu premistunnanu, Neenu ninnu pra’mistu’nnanu, Nenu ninnu premistunnanu
Thai : Phom Rak Khun, Ch’an Rak Khun
Tunisian : Ha eh bak
Turkish : Seni seviyorum!
Urdu : Mujhe tumse muhabbat hai
Vietnamese : Anh ye^u em (man to woman), Em ye^u anh (woman to man), Toi yeu em
Vlaams : Ik hou van jou
Welsh : ‘Rwy’n dy garu di, Yr wyf i yn dy garu di (chwi)
Yiddish : Ikh hob dikh lib
Zazi : Ezhele hezdege (sp?)
Zuni : Tom ho’ ichema
Sign language:
( )
( ) |__|
|__| __ __| |
| |( )( )|__| __
|__||__||__|| | / )
| (__)(__) | / /
| |/ /
| / /
\ /
Tagged under: ,

বিশ্ব মানবতার এক মহান আলোকশিখা মহাত্মা গান্ধী (বাপুজী)

তমাল আর যুথি দুই ভাই-বোন, বয়সে মাত্র একবছরের ছোটবড়। ঢাকার একটা অভিজাত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে একই সাথে পড়ালেখা করছে ওরা। সহসাই এ লেভেল শেষ করতে যাচ্ছে। ওদের ইচ্ছে দেশের বাইরে যাবে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য কিন্তু মা বাবা দুজনেরই ইচ্ছে ওরা যেন দেশেই থাকে। বেচে থাকার অবলম্বন দুই ছেলে মেয়েকে কিছুতেই হাতছাড়া করতে রাজী নন তারা। বাবা তাদের গ্রামের প্রকৃতির সৌন্দর্য বোঝানোর চেষ্টা করেন কিন্তু অতি আধুনিক ছেলে মেয়ের কাছে সেটা ভাল লাগবে কেন? যুথির বাবা আকমল সাহেব জানতে পারলেন তার বন্ধু নাসিফ ইকবাল সম্প্রতিই দেশে এসেছে। ইকবাল সাহেব আর আকমল সাহেব দুজনেই বাল্যবন্ধু। একসাথে কাটিয়েছেন জীবনের লম্বাসময়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ডিগ্রিটা পাওয়ার পরই অতি মেধাবী ছাত্র ইকবালের সুযোগ হয় দেশের বাইরে পড়ালেখার। সে পড়ালেখা করে বিভিন্ন দেশের কৃষ্টি-কালচার, ইতিহাস এর উপর। সর্বশেষ অর্জন ছিল ইসলামের ইতিহাসের উপর পিএইচডি ডিগ্রি। আর তারপর হতেই চষে বেড়িয়েছে পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অন্যপ্রান্ত। কখনো দায়িত্ব পালন করেছেন জাতিসংঘের কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে কিংবা মানবতার আহবানে সাড়া দিয়ে কখনো ছুটে গেছেন রেডক্রিসেন্টের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন দেশের দুর্গত আর অসহায় মানুষের কাছে। এখন দায়িত্বরত আছেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম সংস্থা ওআইসি এর গুরুত্বপুর্ন পদে। ঢাকায় বেশ কিছুদিন কাটানোর পর তিনি এখন আছেন তার শৈববের অতিপ্রিয় গ্রাম গোপালগঞ্জের ননীক্ষীরে।

আগষ্টের জাতীয় শোকদিবস উপলক্ষে বেশকদিন সরকারী ছুটি উপলক্ষে সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান গুলো বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। পরিবার নিয়ে আকমল সাহেব এই সময়টা গ্রামেই কাটাতে চান। সন্তানদের গ্রামের প্রকৃতির ছোয়া দিতে চান। গ্রামে অবস্থানরত আকমল সাহেবের সাথে কখা বলেন তিনি। হ্যা, সেও বেশ অবসর সময় কাটাচ্ছে গ্রামে। এই তো সুযোগ, এই সুযোগটা তিনি হাত ছাড়া করতে চান না। অফিস হতে বেশ কদিন ছুটি বাড়িয়ে নিলেন। অতপর সন্তানদের নিয়ে একদিন হাজির হলেন গ্রামে। ছেলে মেয়েদের পরিচয় করিয়ে দেন তার বন্ধু আকমল সাহেবের সাথে। যুথি আর তমাল সহজেই এই মানুষটিকে বন্ধু করে নেয়। ইকবাল সাহেব তাদের নিয়ে ঘুরেঘুরে পুরো গ্রাম দেখান। দেশ বিদেশের ইতিহাস শোনান। শোনান গ্রীক মিথ হতে আধুনিক সভ্যতার বহু গুরুত্বপুর্ন ঘটনা। দুই ভাইবোন যতই শোনে ততই মুগ্ধ হয়ে যায়। সত্যিই তারা যেন এক মহাজ্ঞানীর দেখা পেয়েছে যার ভান্ডারে শত সহস্র বছরের জ্ঞান সঞ্চিত রয়েছে। পনেরই আগষ্টের দিনে তারা জেলার শোক দিবসের বিভিন্ন কার্যক্রম গুলো ঘুরেঘুরে দেখে। ইকবাল সাহেব তাদের শোনান জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জীবন গাথা ইতিহাস। তার ভাষনের কিছু উল্লেখযোগ্য অংশ যা যুগযুগ ধরে আজো মানুষকে সংগ্রামী হবার অনুপ্রেরনা দিয়ে যাচ্ছে, শোনা মাত্রই শিরদাড়া বেয়ে শীতল এক অনুভুতি পায়ের গোড়ালিতে গিয়ে পৌছায়। তিনি তাদের ব্যাখ্যা করে বোঝান এই মহান নেতা কিভাবে মঞ্চে দাড়িয়ে তাৎক্ষনিক ভাবে বিশাল এক ভাষন রচনা করে মানুষকে স্বাধীনতার জন্য অনুপ্রানিত করে গিয়েছিলেন; বলেছিলেন “আমরা ওদের ভাতে মারব, পানিতে মারব, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম” তাৎক্ষনিক ভাবে কিভাবে তিনি গেরিলা যুদ্ধের সমস্ত উপায় আর রন কৌশল বলে দিয়ে গিয়েছিলেন এক মঞ্চে দাড়িয়েই যা ভেবে আজও সামরিক বিশ্লেষকরা অবাক হয়ে যান এও কি করে সম্ভব হয়েছিল কোন প্রকার পুর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই। তিনি ছিলেন এমনই এক নেতা।

যুথি আর তমালকে তিনি শোনান দ্বিগবিজয়ী সম্রাট আলেকজান্ডারের কথা, মাত্র একুশ বছর বয়সেই সে কি করে পৃথিবী দখল করেছিল। মঙ্গলিয়ানদের স্থপতি বর্ণমলিন ত্বকের চেঙ্গিস খানের কথা, সামান্য এক দাস হতে কি করে তিনি মঙ্গলিয়ানদের স্থপতি হয়েছিলেন, কি করে তিনি মৃত্যুকে জয় করতে চেয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে দ্বিবিজয়ী সম্রাটদের কথা, তাদের ন্যায় পরানয়তার কথা। অন্ধকারাচ্ছন্ন আরবের বুকে মোহাম্মদের হাত ধরে কিভাবে আলোর ছোয়া এসেছিল আর সেই আলোর ছটা ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বময়। মানবতার মহান আলোকদুত, ইশ্বরের সর্বশেষ প্রতিনিধি পুরো আরবের সম্রাট হয়েও কিভাবে তিনি অনাড়ম্বর দিনাতিপাত করতেন। কিম্বা ইসলামের খলিফা হযরত উমরের কথা। খেজুর পাতার একটি বিছানা আর একটি পানির সোহারীই ছিল তার বাসার একমাত্র সম্বল। মরুর বুকে খেজুর গা্ছের ছায়ায় বসে তিনি অবসর কাটাতেন। তিনি তাদের শোনান এজ এ হিউম্যান ফ্রমএ (মানুষরুপে) ঈশ্বর কিভাবে পৃথিবীতে এসেছিলেন আর সেই মানব জাতির কথা যারা তাদের স্বয়ং ঈশ্বরকেই হত্যা করেছিল। সম্রাট সোলায়মান কিভাবে তামাম দুনিয়ার প্রানীদেরকে নিজের আজ্ঞাধীন করেছিলেন। তরুন বয়সেই এক বিজ্ঞানী ক্যালকুলাস আবিস্কার করে কিভাবে পুরো বিশ্বভ্রক্ষান্ডের প্রতি মানুষের চিন্তাধারাকে নিমেষেই পরিবর্তন করে দেন। আর সর্বশেষ স্টিফেন হকিং মাত্র একুশ বছর বয়সেই মটর নিউরন রোগে আক্রান্ত হয়ে অচল শরীর নিয়ে কিভাবে সৃষ্টি রহস্যকে ব্যাখা করেছেন। এইতো পৃথিবীর ইতিহাস, যা একট একটু করে মানুষের সভ্যতার বিকাশকে পাল্টে দিচ্ছে। নিয়ে যাচ্ছে অনন্তের পথে, স্রষ্টার খুবই কাছাকাছি। সেই দিন হয়তো আর বেশী দুরে নয় যেদিন মানুষ স্বয়ং স্রষ্টাকেই খুজে পাবে কিংবা হয়তো তিনিই স্বয়ং ধরা দেবেন মানুষের খুব কাছে এসে।

আকমল সাহেব তাদের শোনান বাদশা ফেরাউনের ইতিহাস। যিনি ছিলেন অত্যাধিক মাতৃভক্ত। আল্লাহর নির্দেশে মুসা ফেরাউনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কিছুতেই তাকে কাবু করতে না পেরে আল্লাহর কাছে অনুযোগ করলেন “হে আল্লাহ, কেন তুমি আমাকে ফেরাউনের সামনে বারবার লজ্জায় ফেলছ? তুমি কি আমার বিজয় চাও না, তুমি কি চাও না তোমার পবিত্র বানীর জয় হোক? আল্লাহ ফেরাউনকে জানালেন; “হে মুসা, ফেরাউন কখনো তার মাকে অসম্মান করে নি আর মায়ের কথার অবাধ্যও হয় নি। তার গর্ভধারীনি মা তার উপর সন্তুষ্ট, তাহলে আমি স্বয়ং আল্লাহ কি ভাবে তার উপর অসন্তুষ্ট হতে ‍পারি? তুমি চেষ্টা কর তার মা যেন তার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে যায় তবে আমিও তার উপর গজব পাঠিয়ে দেব।” ফেরাউন ছিলেন এমনই আল্লাহ (স্রষ্টা) ভক্ত সে প্রতিদিন মুসার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন আর রাতে আধারে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলতেন করত; “হে আল্লাহ তুমি এই যুদ্ধে আমার বিজয় এনে দাও।” নীলনদের পানিতে যখন তার সৈন্যবাহিনীকে ডুবিয়ে দেয়া হয় ফেরাউন আল্লাহর কাছে কেদে কেদে প্রার্থনা করেছিলেন “হে আল্লাহ শেষবারের মত আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি তুমি আমাকে এই পানিতে নিশ্চিহ্ন করে দিও না।” আর তাই তো স্বয়ং আল্লাহ তার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন “আমি তোমাকে নিশ্চিহ্ন করব না তবে তোমার দেহবশেষ পৃথিবী ধ্বংসের পুর্বপর্যন্ত রক্ষা করব।” আল্লাহর প্রতি এই বিশ্বাসের জন্য আল্লাহ হয়তো তাকে এভাবে সম্মানিত করেছেন। এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ হতে তার ‍অপ্রিয় এক বান্দার জন্য উপহার অথচ যে তাকে মনপ্রান দিয়ে বিশ্বাস করত ও ভালবাসত। ঠিক যেভাবে ফেরেশতাদের নেতা আযাযিল আল্লাহকে সর্বোচ্চ সম্মান করতো বলেই মানুষের সামনে মাথা নত করে নি। কারন আল্লাহ পুর্বেই বলে দিয়েছিলেন এই বিশ্বভ্রক্ষান্ডে আমি আল্লাহই এক মাত্র সেজদা পাওয়ার যোগ্য। যখন তিনি দেখতে চাইলেন তার সৃষ্ট ফেরেশতাদের বিচারবুদ্ধি কেমন আর তিনি নির্দেশ দিলেন তোমরা এই মানব কে সেজদা কর। আল্লাহর নির্দেশ তাই সবাই পালন করল কিন্তু স্বর্গ দেবতাদের নেতা আযাযিল চিন্তা করল এই অনন্ত মহবিশ্বে একমাত্র আল্লাহই তো সর্বশক্তিমান এবং সেজদা পাওয়ার যোগ্য তবে কেন আমি এই তুচ্ছ মানবের কাছে মাথা নত করব? আর আল্লাহ এতই সন্তুষ্ট হলেন এবং আবারো ঘোষনা করলেন নিশ্চয়ই আমিই সর্বোচ্চ জ্ঞানী, বিচক্ষন এবং সর্ববিষয়ে জ্ঞাত। কারন তিনি কখনো ভুল করে না। তিনি সবসময়ই সঠিক ব্যাক্তি কে সঠিক স্থানে স্থাপন করেন।
হাটতে হাটতে, খেতে বসে কিংবা রাতের অন্ধকারে বাড়ির আঙিনায় বসে দুই ভাইবোনকে পৃথিবীর আদ্যপান্ত ইতিহাস শোনান ইকবাল সাহেব। এভাবে ইকবাল সাহেব দুই জ্ঞান পিপাসু তরুন-তরুনীর অন্তরে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বন্ধু হিসেবে ধরা দেন। যতই দিন যায় তাদের মন ক্রমশই অস্থির হতে থাকে কারন তাদের ঢাকা ফিরে যাবার দিন যে ঘনিয়ে এসেছে। এই জ্ঞান সমুদ্র ছেড়ে যেতে তাদের কিছুতেই মন চাইছে না। যতই দিন যায় জ্ঞাঢন সমুদ্রের নুড়ি পাথর নিয়ে আরো খেলার জন্য তাদের মন অস্থির হতে থাকে। ওদের জানার আগ্রহ ক্রমশই বাড়তে থাকে। একেই কি বলে সত্যিকারের জ্ঞান পিপাসু? না আরো জানতে হবে, ওদের মধ্যে জানার প্রবল আগ্রহ চেপে বসে।

একদিন ওরা ইকবাল সাহেবকে প্রশ্ন করে; আচ্ছা আংকেল। পবিত্র কোরানে আল্লাহ তো বলেছেন তিনি প্রত্যেক জাতির জন্য এক বা একাধিক পথপ্রদর্শক পাঠিয়েছেন। কিন্তু এই ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য কি কেউ শান্তির বানী নিয়ে স্রষ্টার পক্ষ হতে এসেছিল?
ইকবাল সাহেব প্রশ্নটা শুনে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন; তাই তো! এমন করে তো কখনো ভাবেন নি। তিনি তার জ্ঞানের ঝুলি হাতড়ে চলে গেলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের পাতায়, তন্ন-তন্ন করে খুজলেন স্রষ্টার অভিধান গুলো, পাঠ করলেন স্মৃতির পৃষ্ঠায়-পৃষ্ঠায়। অবশেষে তিনি একজন ব্যাক্তির দেখা পান, যার ব্যাক্তিত্ব আর জীবন কার্যক্রমকে তুলনা করা যেতে পারে সেই সব মহান মানুষগুলোর সাথে যারা অন্ধাকারাচ্ছন্ন আরবের বুকে একবিন্দু আলোর ছটা এনে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বময়। কিন্তু তিনি স্রষ্টা প্রেরিত আলোর দুত ছিলেন কিনা? এই প্রশ্নের উত্তর খুজে পান না তিনি। হ্যা, তার মনে পড়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিখ্যাত উক্তি, তিনি যুগে-যুগে মানুষ রুপে এই পৃথিবীতে এসেছেন এবং আসবেন। তিনি আসবেন মানব সভ্যতার যে কোন ক্রান্তিলগ্নে। যেমন এসেছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের এই অতি সাধারন মানুষটি। তিনি ঈশ্বরের একজন প্রতিনিধিও হতে পারতেন!

ইকবাল সাহেব ওদের আরো কাছে এসে বসতে বলেন। নতুন কিছু শোনার উদ্দিপনায় দুজনের শরীর শিহরিত হয়ে ওঠে। ইকবাল সাহেব বলতে লাগলেন; আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশে এমন একজন ব্যাক্তি জম্নেছিলেন যাকে মানুষরুপে স্রষ্টার জম্নগ্রহন বললেও হয়তো ভুল হবে না। তার জীবনাদর্শকে তুলনা করা যেতে পারে সেই সব মহা মানবদের সাথে যারা যুগে যুগে এই পৃথিবীকে অন্ধকার মুক্ত করার জন্য শান্তির বানী নিয়ে এসেছিলেন। তবে আমি জানি না তিনি স্রষ্টা প্রেরিত কোন পথপ্রদর্শক ছিলেন কিনা। তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান ভারতীয় রাজনীতিবিদ, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের রুপকার এবং প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক নেতা। তিনি ছিলেন সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। এর মাধ্যমে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনসাধারণের অবাধ্যতা ঘোষিত হয়েছিল। এ আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অহিংস মতবাদ বা দর্শনের উপর এবং এটি ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম চালিকা শক্তি, সারা বিশ্বে মানুষের স্বাধীনতা এবং অধিকার পাওয়ার আন্দোলনের অন্যতম অনুপ্রেরণা। তিনি ভারতের জাতির জনক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বা মহাত্মা গান্ধী যিনি আগামী প্রজন্মের জন্য আদর্শ*। ভারতে এবং বিশ্ব জুড়ে মহাত্মা (মহান আত্মা) এবং বাপু (বাবা) নামে তিনি পরিচিত। মহাত্মা গান্ধী সমস্ত পরিস্থিতিতেই অহিংস মতবাদ এবং সত্যের ব্যাপারে অটল থেকেছেন। তিনি অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন।

এই মহান মানুষটির পরিধেয় কাপড় ছিল একটুকরো ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় ধুতি এবং শাল যা তিনি নিজেই চরকায় বুনতেন এবং যা কখনোই তার পুরো শরীরকে আচ্ছাদিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। এমনকি তিনি নিজের পরিধেয় কাপড় নিজেই পরিস্কার করতেন। তিনি সাধারণ নিরামিষ খাবার খেতেন। আত্মশুদ্ধি এবং প্রতিবাদের কারণে দীর্ঘ সময়ের জন্য উপবাসও থাকতেন। তার মুলনীতি ছিল: সত্য, অহিংসা, নিরামিষভোজন, ব্রহ্মচর্য, বিশ্বাস এবং সরলত্ব।

মহাত্মা গান্ধী তার জীবনকে সত্য অনুসন্ধানের বৃহৎ উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, এবং নিজের উপর নিরীক্ষা চালিয়ে তা অর্জন করেছিলেন। গান্ধী বলেন তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল নিজের অন্ধকার, ভয় ও নিরাপত্তাহীনতাকে কাটিয়ে ওঠা। গান্ধী তাঁর বিশ্বাসকে সংক্ষিপ্ত করে বলেন, ঈশ্বর হল সত্য এবং সত্য হল ঈশ্বর। এর অর্থ সত্যই হল ঈশ্বরের ক্ষেত্রে গান্ধীর দর্শন।

অহিংসার ধারনার বহিঃপ্রকাশ হিন্দু ধর্মীয় চিন্তাধারা এবং নিদর্শন হিসেবে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, ইহুদি এবং খ্রিষ্টান বর্ণণায় পাওয়া যায়। গান্ধীজী বলেন: যখন আমি হতাশ হই , আমি স্মরণ করি সমগ্র ইতিহাসেই সত্য ও ভালবাসার জয় হয়েছে । দুঃশাসক ও হত্যাকারীদের কখনো কখনো অপরাজেয় মনে হলেও শেষ সবসময়ই তাদের পতন ঘটে সর্বদাই।

শিশু থাকতে গান্ধী পরীক্ষামূলকভাবে মাংস খান। এটি হয়ত তার বংশগত কৌতুহল ও তার বন্ধু শেখ মেহতাবের কারণে হয়েছিল। নিরামিষভোজন এর ধারণা হিন্দু ও জৈন ধর্মে গভীরভাবে বিদ্যমান। নিরামিষভোজনই ছিল ব্রহ্মচর্চায় তার গভীর মনযোগের সূচনা। মুখের উপর নিয়ন্ত্রণ না আনতে পারলে তার ব্রহ্মচার্য্য ব্যর্থ হতে পারত বলে তিনি বলে গেছেন।

গান্ধীর ষোল বছর বয়সে তার বাবা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। গান্ধী তার বাবার অসুস্থতার পুরো সময় তার সাথে থাকেন। একরাতে গান্ধীর চাচা এসে তাকে বিশ্রাম নেবার সুযোগ করে দেন। তিনি তার বেডরুমে ফিরে যান এবং কামনার বশবর্তী হয়ে তার স্ত্রীর সাথে প্রণয়ে লিপ্ত হন। এর সামান্য পরেই একজন কর্মচারি এসে তার পিতার মৃত্যুসংবাদ জানায়। তিনি এ ঘটনাটিকে দ্বিগুণ লজ্জা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই ঘটনাটি গান্ধীকে ৩৬ বছর বয়সে বিবাহিত থাকা অবস্থায় একজন সেলিবেট হতে বাধ্য করে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ব্রহ্মচর্যের দর্শন তাকে ব্যাপকভাবে প্ররোচিত করে, যা আদর্শগত ও বাস্তবগত পবিত্রতার চর্চা করে। গান্ধী ব্রহ্মাচারকে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ এবং আত্মোপলব্ধির পন্থা হিসেবে দেখতেন। গান্ধী তার আত্মজীবনীতে তার শৈশবের স্ত্রী কাস্তুর্বার সম্পর্কে তার কামলালসা এবং হিংসার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার কথা বলেন। গান্ধী আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আদর্শ হবার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন যেন তিনি ভোগ করার বদলে ভালোবাসতে শেখেন। গান্ধীর কাছে ব্রহ্মচর্যের অর্থ ছিল “চিন্তা, বাক্য ও কর্মের নিয়ন্ত্রণ”।

তিনি বলেন “হিন্দুবাদ আমাকে পরিপূর্ণভাবে তৃপ্ত করে, আমার সম্পুর্ণ স্বত্ত্বাকে পরিপূর্ণ করেছে। যখন সংশয় আমাকে আঘাত করে, যখন হতাশা আমার মুখের দিকে কড়া চোখে তাকায়, এবং যখন দিগন্তে আমি একবিন্দু আলোও দেখতে পাই না, তখন আমি ভগবত গীতার দিকে ফিরে তাকাই, এবং নিজেকে শান্ত করার একটি পংক্তি খুঁজে নিই; এবং আমি অনতিবিলম্বে অত্যাধিক কষ্টের মাঝেও হেসে উঠি। আমি ভগবত গীতার শিক্ষার কাছে কৃতজ্ঞ। যদি আমি খ্রিস্টান ধর্মকে নিখুঁত এবং শ্রেষ্টতম ধর্ম হিসেবে মেনে নিতে না পারি, তবে হিন্দু ধর্মকেও সেভাবে মেনে নিতে পারি না। যদি অস্পৃশ্যতা হিন্দু ধর্মের অংশ হয় তবে, এটি একটি পচা অংশ বা আঁচিল। বেদবাক্যগুলোকে ঈশ্বরের অনুপ্রাণিত উক্তি বলার কারণ কি? যদি এগুলো অনুপ্রাণিত হয় তবে বাইবেল বা কোরান কেন নয়। যখনি আমরা নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলি, আমরা ধার্মিক হওয়া থেকে ক্ষান্ত হই। নৈতিকতা হারিয়ে ধার্মিক হওয়া বলতে কিছু নেই। যেমন মানুষ মিথ্যাবাদী, নির্মম এবং আত্মসংযমহীন হয়ে দাবি করতে পারে না যে ঈশ্বর তার সাথে আছেন। হ্যাঁ, আমি তাই। এ ছাড়াও আমি একজন খ্রিস্টান, একজন মুসলিম, একজন বৌদ্ধ এবং একজন ইহুদি।”

গান্ধী প্রবলভাবে বিশ্বাস করতেন যে, সামাজিক কাজে নিয়োজিত একজন ব্যক্তি অবশ্যই সাধারণ জীবন যাপন করবে যেটা তার মতে তাকে ব্রহ্মচর্যের পথে নিয়ে যাবে । তাঁর সরলত্বের সূচনা ঘটে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাপিত পশ্চিমি জীবনাচরণ ত্যাগ করার মাধ্যমে। তিনি এটিকে “শুন্যে নেমে যাওয়া” হিসেবে আখ্যায়িত করেন যার মধ্যে ছিল অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে ফেলা, সাদামাটা জীবনযাপন গ্রহণ করা এবং নিজের কাপড় নিজে ধোয়া। আর তাই তো এই মহান মানুষটির পরিধেয় কাপড় ছিল একটুকরো ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় ধুতি এবং শাল যা তিনি নিজেই চরকায় বুনতেন এবং যা কখনোই তার পুরো শরীরকে আচ্ছাদিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না এবং তিনি নিজের পরিধেয় কাপড় নিজেই পরিস্কার করতেন।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে গান্ধীর অস্ত্র ছিল অসহযোগ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ এবং মানুষকে ভালবাসতেন তিনি নিজের চেয়েও বেশী। অসত্যের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন ইস্পাতের মত কঠিন আর মানবতার কাছে কর্পুর সম। দি থিওরি ‍অফ সাইক্লিক্যালি সিমেট্রিক এস্কপ্রেসন সর্ম্পকে জান তমাল, যুথি? প্রশ্ন করেন ইকবাল সাহেব।

দুজনে একে অপরের মুখের দিকে তাকায় ওরা। হ্যা, জানি। আমরা ম্যাথমেটিকসে পড়েছিলাম। সংক্ষেপে একে সাইক্লিক ‍অর্ডার বলা হয়।
আমাদের এই বিশ্ব ভ্রক্ষান্ড চলছে এই সাইক্লিক অর্ডার মতে। তাই ঘুরেফিরে ঘটনাগুলো আবর্তিত হয়। মানবতার মহান এক পথপ্রদর্শককে বিতাড়িত করা হয়েছিল তার প্রিয় মাতৃভুমি হতে। তিনি মাতৃভুমি ত্যাগ কালে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলেছিলেন “হে আমার স্বদেশ তুমি কতই অপরুপ, আমি তোমাকে ভালবাসি কিন্তু তোমার সন্তানেরাই তো আমাকে থাকতে দিল না।” আর ক্রশবিদ্ধ হয়ে ইশ্বর কি বলেছিলেন জান? “পবিত্র পিতা কেন তুমি আমাকে ত্যাগ করেছ? এরা তো জানে না এরা কি করছে? তুমি এদের ক্ষমা করে দাও।” আর সেই ঘটনাও পুনরাবৃত্তি হয়েছিল আমাদের বাপুজীর ক্ষেত্রেও। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। যখন তিনি নতুন দিল্লীর বিরলা ভবন মাঝে রাত্রিকালীন পথসভা করছিলেন আর মৃত্যু কালে শেষ উচ্চারন করেছিলেন “হে রাম”। “হে রাম” যাকে অনুবাদ করে বলা যায় “ও ঈশ্বর” এই শব্দ দুটিকে গান্ধীর শেষ কথা বলে বিশ্বাস করা হয়।

এবং বাপুজীর প্রতি মানুষের ভালবাসা ফুটে উঠেছিল এভাবে: “বন্ধু ও সহযোদ্ধারা আমাদের জীবন থেকে আলো হারিয়ে গেছে, এবং সেখানে শুধুই অন্ধকার এবং আমি ঠিক জানি না আপনাদের কি বলব, কেমন করে বলব। আমাদের প্রেমময় নেতা যাকে আমরা বাপু বলে থাকি, আমাদের জাতীর পিতা আর নেই। হয়ত এভাবে বলায় আমার ভূল হচ্ছে, তবে আমরা আর তাকে দেখতে পাব না যাকে আমরা বহুদিন ধরে দেখেছি, আমরা আর উপদেশ কিংবা স্বান্ত্বনার জন্য তার কাছে ছুটে যাব না এবং এটি এক ভয়াবহ আঘাত, শুধু আমার জন্যই নয়, এই দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য।”** হয়তো বা পুরো মানব জাতীর জন্যই।


*মহাত্মা গান্ধী, আগামী প্রজন্মের জন্য আদর্শ। (a role model for the generations to come) ; পদার্থবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ।
**জাতীর উদ্দেশ্যে জওহরলাল নেহরুর বানী।
ছবি: ইন্টারনেট হতে সংগৃহিত।