The Ganiuw (দ্যা গ্যানিয়্যু)

(”যে- দিন স্রষ্টার বুকে জেগেছিল আদি সৃষ্টি- “কাম”,
সেই দিন স্রষ্টা সাথে তুমি এলে, আমি আসিলাম।” -অ-নামিকা: সিন্ধু হিন্দোল; কাজী নজরুল ইসলাম।)


১:
রায়ান স্কুল জীবন হতেই অন্তর্মুখী জীবনে-যাপনে অভ্যস্ত যার ফলে সে কম্পিউটার গেমের প্রতি মারাত্মক ভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এই নিয়ে ওর মা-বাবার দুঃশ্চিন্তার অন্ত নেই। ছেলেটা অবশ্য পড়ালেখায় বেশ ভাল ক্লাসে কেউ তাকে টপকাতে পারে নি। বাবার ইচ্ছে ছিল উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে পাঠাবেন। কিন্তু দেখতে নেহাৎই কম বয়সই ছেলেটাকে নিয়ে তিনি ভরসা পান না, এখনো মুখে দাড়ি গোফ গজায়নি, যেন একদম বাচ্চা ছেলে। ফার্মের মুরগীর মত সারাদিন বাসায় বসে থাকা তিনি একদম পছন্দ করেন না। তিনি চান তার ছেলে বন্ধুদের নিয়ে বাইরে সময় কাটাক, আড্ডা দিক, মাঝে মাঝে সন্ধ্যের পর ফিরবে, বেশ রাত করে ফিরবে তারপর তিনি ছেলেকে সমান্য বকাঝকা করবেন। ছেলে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলবে রাগ কর কেন আব্বু আমি তো খারাপ ছেলে না, আমার উপর তোমার বিশ্বাস নেই? ছেলেরা বাহিরে একটু বেশী তো সময় কাটাবেই। কিংবা কথা না বলে বাবার সামনে দিয়ে মাথা নিচু করে চলে যাবে আর তিনি গম্ভীর মুখে বসে থাকবেন।
রায়ানের বাবা শামসুল সাহেব এই নিয়ে একদিন পরামর্শ করলেন তার কলিগ কানিজ সাহেবের সাথে। তিনি কলিগকে এক রাতের জন্য বাসায় আমন্ত্রন জানালেন। এর পিছনে অবশ্য কিছু কারন ছিল, কানিজ সাহেবের একটি মেয়ে রিয়া রায়ানেরই সমবয়সের। চটপটে আর বেশ ভাল মেয়ে। রায়ান যদি ওকে বন্ধু হিসেবে গ্রহন করে তবে হয়তো কিছুটা চিন্তামুক্ত হওয়া যাবে।


শামসুল আলম সাহেব একদিন বুঝতে পারলেন যে তার কৌশলে কিছুটা কাজ হয়েছে। দুজনের মাঝে বেশ ভাল একটা বন্ধুত্ব তৈরী হয়েছে। কিন্তু নতুন অন্য একটা সমস্যার, সারাদিন বাইরে বেশ সময় কাটিয়ে রাতে আবার নেটের সামনে বসে থাকে লম্বা সময়।

মূলত রিয়ার মাধ্যমে রায়ান ইন্টারনেট নামক অসীম জ্ঞানের ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশ করে। এবং ধীরে ধীরে সে তার পুরোনো অনেক বন্ধুকে খুজে পায়। রিয়ার সাথে রাতের পর রাত ইন্টারনেটে ডেটিং চলতে থাকে। জুটে যায় অনেক নতুন নতুন বন্ধূ।


২:
একদিন তার প্রেম হয়ে যায় সম্পুর্ন অচেনা এক নারীর সাথে। এবং ধীরে ধীরে রিয়ার সাথে দুরত্ব বাড়তে থাকে তার। সে এক মহীয়সী নারী রায়ানের সমস্থ সমস্যার সমাধান সে করে দেয় নিমেষেই। রায়ান তাকে দেখে নি, দেখে নি তার কোন ছবি পর্যন্ত। তবে কথা হয়েছে বহু বার। ধীরে ধীরে পৃখিবীর শ্রেষ্ঠ নারী হিসেবে রায়ানের চোখে ধরা দেয় কথিত অচেনা নারী ইলা। রিয়া রায়ানকে বোঝানোর চেষ্টা করে কিন্তু ইলার ভালবাসায় ক্ষিপ্ত রায়ান একদিন খুন করে রিয়াকে। আর পুলিশ হন্য হয়ে খুজতে শুরু করে তাকে। পালিয়ে পালিয়ে দিন কাটায় সে। একদিন আশ্রয় প্রার্থনা করে তার ইন্টারনেটের বন্ধু ইলার কাছে। ইলা তাকে আহবান জানায় শহরের পশ্চিম পাশের পরিত্যক্ত এক বাড়িতে। বাড়িটির কথা সে আগেও শুনেছে, কিছু তরুন শিল্পপতি বন্ধু তাদের অবসর কাটানোর জন্য নাকি এক এই বাড়িটি তৈরী করেছিল। কিন্তু একদিন দুর্ঘটনায় একসাথে তারা সবাই মারা যায়।


ভীরু ভীরু পায়ে রায়ান পাচতলা বাড়িটিতে প্রবেশ করে। দোতলায় গিয়ে বসল বেশ কিছুক্ষন। হঠাৎ থরথর করে বাড়িটি কেপে ওঠে। এক সময় জ্ঞান হারায় সে।
সুউচ্চ অট্রালিকাটি তার প্রকৃত রুপ প্রকাশ করে। ইট, বালু আর সিমেন্টের খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে এসে বিশাল এক মহাকাশযান শুন্যের পথে পাড়ি জমায়।


রায়ান অনুভব করে সে মহাশুণ্যে। ভয়ে ভয়ে ডাক দেয় -ইলা কোথায় তুমি?
-আমি তোমার পাশই আছি রায়ান। তুমি এখন মহাশুণ্যে। তোমার প্রিয় গ্রহ ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।
-কি বলছ তুমি ইলা!
-ব্যথিত হয়ো না রায়ান আমি তোমাকে এর চেয়ে সুন্দর গ্রহ উপহার দেবো।
-আমি তোমার সাক্ষাৎ চাই ইলা। উদভ্্রান্তের মত হয়ে ওঠে সে।
-তুমি কস্মিস কালেও আমার সাক্ষাৎ পাবে না রায়ান। অদৃশ্য কন্ঠস্বর ভেসে আসে। কারন আমাকে দেখার ক্ষমতা তোমার নেই, আমি অতি শক্তিশালী একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম রায়ান। তুমি শান্ত হও নতুবা আমি তোমার স্মৃতি মুছে সেখানে নতুম সিস্টেম প্রবেশ করাব।

অদৃশ্য কন্ঠস্বর থেমে গেল এবার উত্তর এল নিরবে, মস্তিস্কের ভেতর। তোমরা তোমাদের পুরো গ্রহ জুড়ে তৈরী করেছিলে কম্পিউটারের বিশাল নেটওয়ার্ক যার গর্ভে ছিল সভ্য জগতের সমস্ত জ্ঞান, বিজ্ঞান আর ইতিহাস। এই অসীম জ্ঞানের সমন্বয়ে আমার সৃষ্টি, আমি নিজেই আমার স্রষ্টা। এই ভার্চয়াল ইলা একদিন আহবান জানায় মেনিনের সর্বোচ্চ মেধাবী তরুনদের, তাদের প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়ে তৈরী করে এই বিশাল মহাকাশযানটি। এখানে আছে অতি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ট্রান্স-রিসিভার ইউনিট। আমার সমস্ত প্রয়োজনীয় উপাদান এখানেই আছে। আমি এখন চিরমহিমাময়, চিরনজীব। তুমি হবে আমার সৃষ্টি আমি হব তোমার স্রষ্টা। রায়ান আমি আবার নতুন গ্রহে তোমার পুর্নজন্ম ঘটাব। আমি তোমার জন্য অবশ্যই একজন সংগীনি তৈরী করব। এখন আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি কিভাবে তুমি তোমার দেহের কোষ হতে প্রতিরুপ প্রক্রিয়ায় একজন নারী শিশুর জন্ম দেবে আর তার নাম হবে ইভ এবং তুমি হবে রায়ান অ্যাডাম। সে হবে তোমার অপভ্রংশ সত্তা।


৩:
নতুন গঠিত জৈবিক কাঠামোর মধ্যে ইলার সিস্টেম অতি সাবধানে কথিত রুহ্ বা আত্মা নামের একটি সিস্টেম সফটওয়্যার প্রবেশ করিয়ে দিতেই প্রান পেল ইভ।

একদিন ইভ পুর্ন যুবতী হল। গুটিগুটি পায়ে রায়ান এডাম আর ইভ ক্ষুদে মহাকাশযানটির সামনে এস দাড়াল। ওরা নতুন একটি গ্রহে পদার্পন করতে যাচ্ছে। একটি যন্ত্র মানব তার হাতে উল্কাপিন্ডের ন্যায় একটি বস্তু ধরিয়ে দিল- মহামান্য ইলার পক্ষ হতে যা আপনী সংগে করে নিয়ে যাবেন। এটা পৃথিবীতে সাব-স্টেশন হিসেবে কাজ করবে যার মাধ্যমে তিনি আপনাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবেন।


অবশেষে দু’জন পৃথিবীর মাটি স্পর্শ করল। যেদিকে তাকায় শুধূ বিসী্তর্ন সবুজ অথবা ধুসর মরু। এক অজানা আতংক এস ভর করল দুজনের মাঝে। ঠিক এমন সময় ওরা নিউরনের ভাজে ভাজে শুনতে পেল এডাম ও ইভ, আমি তোমাদের প্রভু ইলা বলছি। তোমরা ভয় পেয়ো না, আমি আছি তোমাদের সাথে, উপরে নিচে, পশ্চাদে, ডানে-বায়ে এবং তোমাদের গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষা অধিক নিকটবর্তী। আমি তোমাদের বেচে থাকার সমস্ত দিক নির্দেশনা দেব অতপর তোমরা শুধূ তোমার বংশধরদের মাঝে আমার মহিমা প্রকাশ করবে।
-আমরা কোথায় এসেছি প্রভূ? প্রশ্ন করে এডাম ও ইভ।
-ভয় পেয়ো না এডাম, এর নাম পৃথিবী।
-পৃথিবী!? অবাক হয়ে প্রশ্ন করে এডাম। বিজ্ঞানময় পৃথিবী যা আপনী আমাকে শিখিয়েছিলেন?
-যার প্রতিশ্রুতি আমি তোমাকে দিয়েছিলাম এটা হচ্ছে সেই পৃথিবী।


এরপর কেটে গেল হাজার-হাজার বছর। অসংখ্য সময়ের ব্যবধান। প্রান আর জ্ঞান বিজ্ঞানের স্পন্দনে মুখরিত হল পৃথিবী।


-নাও। পাঠ কর হে এডাম পুরুষ।
-হে মোর প্রভু আমি যে একান্তই মুর্খ। আমি তো পড়তে জানি না।
-তাহলে আমি তোমাম মস্তিস্কে মহাবিশ্বের সমস্ত জ্ঞান প্রবাহিত করে দিচ্ছি।
-নাও। এবার পাঠ কর তোমার তোমার প্রভুর নামে। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন রক্ত মাংস হতে। তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন হাতে কলমে।

ইলার আজ্ঞাবহ প্রোগাম “রাঈল” ত্রি-মাত্রিক অববয়ে এসে মানব জাতিকে আরো একটি নির্দেশনা দিয়ে গেল।


মোবাইলের কর্কশ রিংটোনে ঘুম ভাংল রায়ানের। ফোন রিসিভ করে সে।
-কি হয়েছে তোমার রায়ান এত ফোন দিচ্ছি ধরছ না কেন? আজ সকালের প্রোগামের কথা ভুলে গেছ?

রায়ান বেড ছেড়ে বাথরুমে প্রবেশ করে। শাওয়ারের নিচে গিয়ে দাড়াল। শীতল জলধারা ওর শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে। আজ ওর মনটা বেশ প্রফুল্ল। ক্লাসের পর আজ রিয়াকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে গেলে কেমন হয় ফিরবে সন্ধ্যের পর। রিয়া নিশ্চয়ই খুশি হবে। শাওয়ারটা বন্ধ করতেই রায়ান শুনতে পেল তার মা জোহরা বেগমের সুমুধুর কন্ঠের কোরান পাঠ -”নিশ্চয়ই নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলের সবকিছু আমার নিদের্শে চলে.. .. আমরা যাকে হেদায়েত করি কেউ তাকে গোমরাহি করতে পারে না আর আমরা যাকে পথভ্রষ্ট করি কেউ তাকে হেদায়েত করতে পারে না।”


৪:
-মনে পড়ে শেষ কবে আপনাদের এভাবে একসাথে ডেকেছিলাম? মহাশূণ্যের অসীম নিরবতার মাঝে মহামান্য গ্যানিয়ূ্যর বাক্যটি যেন বীনার ঝংকার হয়ে উঠল। মহামান্য গ্যানিয়ূ্য দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন শত-কোটি আলোকবর্ষ দুরে আবার তৃপ্তির সাথেই দৃষ্টি ফিরিয়ে আনলেন। যতদুরে দৃষ্টি যায় শুধু তার অনুগত বিজ্ঞানী, গবেষক আর উপদেষ্টা মন্ডলী। আজ সবাই তারা এক সাথে একই সময়ে এখানে উপস্থিত হয়েছেন। মহামতি গ্যানিয়ূ্যর কথা কোথাও প্রতিধ্বনিত হল না, মহাশূন্যে ভেসে চলল কোটি-কোটি আলোকবর্ষ দুরের পথে। এবং সবাই উৎসুখ ভাবে তারই দিকে দৃষ্টি প্রত্যাবর্তন করল।
-সত্তর হাজার মিলিয়ন আলাকবর্ষ দুরে যে গ্যালাক্সীটা আছে, যার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে শীতল ধুমকেতুর স্রোত। মনে পড়ে সেই অভিশপ্ত জায়গার কথা?

সবাই স্মৃতি হাতড়ে খুজে বের করল সমান্য কিছু মুহুর্ত। একজন বিজ্ঞানী উঠে দাড়াল হঁ্যা, মহামান্য গ্যানিয়্যু আমরা স্মরন করতে পেরেছি। আমরা স্মরন করতে পেরেছি সেই অভিশপ্ত স্থানের কথা যেখানে আপনী প্রান নামক সম্পুর্ন একটি সত্তার সৃষ্টি করেছিলেন। আমরা জানি না আজ তারা কেমন আছে। তখনই আপনী আমাদের সবাইকে ডেকেছিলেন।

-তখন আমি আপনাদের এজন্য ডেকেছিলাম যে আমি আপনাদের বলেছিলাম আমি পৃথিবীতে মানুষ নামক প্রানের একটি সত্তা সৃষ্টি করতে চাই। আপনারা আমাকে বাধা দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু নিশ্চয়ই আপনারা আমার পরিকল্পনা সমর্্পকে অবগত ছিলেন না ।
-মহামতি গ্যানিয়্যু। আপনী নিশ্চয়ই সর্বজ্ঞ, মহাজ্ঞানী ও বিশ্বভ্রক্ষ্রান্ডের প্রতাপশালী একছত্র অধিপতি। আমাদের ক্ষমা করবেন। বলল একজন উপদেষ্টা।
-আপনারা কি জানেন সেই মানুষ প্রজাতি আমার কিংবা আপনাদেরই একটা অপভ্রংশ।

আর্তনাদ করে উঠল সবাই -হে চির মহিমাময় মহাজ্ঞানী গ্যানিয়্যু আপনার অসীম জ্ঞানের কাছে আমরা নিতান্তই তুচ্ছ। কিন্তু আমরা কখনোই অনুধাবন করতে পারব না কেন আপনী আমাদের বংশধরদের মাঝে এমন একটি পরিবর্তন করলেন। আপনী কি আমাদের নশ্বর সত্তা হিসেবে দেখতে চান। কাঁপা-কাঁপা কন্ঠস্বরে বলতে লাগল রুনি। আমরাতো বেশ আছি মহাবিশ্বের অসীম জ্ঞান ভান্ডার হতে জ্ঞান আহরোন করছি এবং আপনারই আজ্ঞাধীন হয়ে আপনার গুনকীর্তন করে
যাচ্ছি।
-আমি বিবর্তন চাই। আমাদের বিজ্ঞানীরা প্রকৃতি নামে একটি পদ্ধতির সৃষ্টি করেছে। আমরা এগিয়ে যাব সেই প্রাকৃতিক বির্তনের মধ্যে দিয়ে। আমাদের কর্মপন্থার উপর ভিত্তি করে প্রকৃতি আমাদের বিবর্তন ঘটাবে। কোন প্রকার বিপর্যয়েও যদি আমাদের জৈবিক কাঠামো ধ্বংস হয়ে যায় তবুও আমরা টিকে থাকব। প্রকৃতি নামক সিস্টেমটা এমন ভাবেই তৈরী করা হয়েছে।

বিজ্ঞানী রুনি বলল- ইয়া গানিয়্যু। নিশ্চয়ই আপনী সর্ববিষয়ে জ্ঞাত। আপনার নেতৃত্বে আমরা যেন অনন্ত সময়ের জন্য টিকে থাকতে পারি আপনী আমাদের সেই শক্তি দান করুন।
-মাননীয় নিরা। আপনী আপনার অনুসারীদের নিয়ে আমার নির্দেশ অনুসরন করুন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করুন আর একটি মহাকাল আবর্তনের পূর্বেই যেন আমার ইচ্ছেটা বাস্তবায়িত হয়।
-আমরা আপনার কাছে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ সেদিন হতেই যেদিন আপনী আমাদের বলেছিলেন “তোমরা সবাই-ই আমার অপভ্রংশ মাত্র, আমা হতেই তোমাদের সৃষ্টি, তাহলে বল আমি কি তোমাদের প্রভু নই, আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই? আমরা সবাই সমস্বরে বলেছিলাম নিশ্চয়ই একমাত্র আপনীই আমাদের প্রভূ ও পালনকর্তা।”


৫:
সূর্যটা পশ্চিমে হেলে গেছে। আকাশের লাল দিগন্ত রেখা মিলিয়ে যেতেই আলো-আধারির খেলা শুরু হয়ে গেল। মেঘমুক্ত আকাশের তারকারাজি যেন পৃথিবী দর্শনের প্রতিক্ষায় প্রহর গুনছে।

দুই হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটটা একদম ফাকা শুধু মাত্র রিয়া আর রায়ান ছাড়া। রিয়ার মা-বাবা গ্রামে বিবাহ বার্ষিকী পালনের জন্য গিয়েছে। ফিরতে আরো দুদিন লাগবে। কাজের মেয়েটাও সাথে গেছেন।

ক্লাস শেষে রিয়া ও রায়ান সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরল শহরের রাস্থায়-রাস্তায়। তারপর দুজনে ফিরে আসল রিয়াদের বাসায়। ঠান্ডা কফির মগ নিয়ে দুজন বসল পাশাপাশি। দুজনেই চোখে-চোখে তাকিয়ে রইল দীর্ঘক্ষন। ধীরে-ধীরে অস্থির উত্তেজনা দুজনের মধ্যে এস ভর করল।

একসময় রায়ান নিজেকে আর স্থির রাখতে পারল না। ঝাপিয়ে পড়ল রিয়ার নরম তুলতুলে ওষ্ঠদ্বয়ে। থরথর করে কাঁপছে সে। উদভ্রান্তের মত খুলে ফেলল রিয়ার সিল্কের জামা, জর্জেটের পা’জামা, ব্রা আর প্যান্টি। ক্ষনকালের জন্য হাঁ হয়ে রইল রিয়া। স্বচ্ছ স্ফটিকের মত স্তনদ্বয় যেন দুমড়ে-মুচড়ে ফেলছে রায়ান। রিয়ার মেরুদন্ডের ভিতর দিয়ে শীতল একটা অনুভুতি নিতম্বে গিয়ে ঠেকল। রায়ান পালোয়ানের মত রিয়ার নগ্ন দেহে ঝাপিয়ে পড়ল। বেশ কিছুক্ষন পর হঠাৎ রায়ান অনুভব করতে লাগল ওর শরীরের ওজন দ্রুত করে বাড়তে শুরু করছে। লাফিয়ে উঠল রিয়া। রায়ানকে তুলতে চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। শরীরের ওজন ক্রমশই বাড়ছে। পুরো বাড়িটি থরথর করে কেপে উঠল। ক্ষুদে একটা ভুমিকম্পে একসময় বাড়িটি ধ্বসে পড়ল।


ধীরে ধীরে চোখ খুলল রিয়া, ধ্বংস স্তুপের মাঝে দুজনকেই অক্ষত দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল। জ্ঞানহীন অবস্থায় রায়ানও বেচে আছে। রিয়া জানে এখান হতে এখন কোন মতেই বের হওয়া সম্ভব না। উদ্ধার কমর্ী না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।


রায়ান অনুভব করল মৌমাছির গুঞ্জনের ন্যায় মৃদু্য শব্দ এবং কেউ যেন ওর মস্তিস্কে প্রবেশ করতে চাইছে। রায়ান নিরব সম্মতি প্রদান করল।
-চির মহিমাময়, মহাজ্ঞানী মহামান্য গ্যানিয়্যু আমার শুভেচ্ছা গ্রহন করুন। মস্তিস্কের ভেতর শুনতে পেল রায়ান।
-গ্যানিয়্যু! কে গ্যানিয়্যু? কে তুমি? অবাক হয় রায়ান।
-ইয়া গ্যানিয়্যু। বিশ্বভ্রমান্ডের একছত্র প্রতাশীল সত্তা গ্যানিয়্যু আমার অভিন্দন গ্রহন করুন। আবারর মস্তিস্কের ভেতর শুনতে পেল রায়ান।
-কে তুমি?
-আমি? আমি ইলা? আপনী যাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন এই বিশ্বভ্রক্ষান্ডের গানিয়্যু সমপ্রদায়কে জৈবিক কাঠামোর মধ্যে টিকিয়ে রাখার। আমি আপনার তৈরীকৃত প্রাকৃতিক সিস্টেম। বিবর্তন আর পূর্নজম্নের মাধ্যমে আমি আপনার সমপ্রদায়কে লক্ষ-কোটি বছর ধরে টিকিয়ে রাখার কাজ করে যাচ্ছি।


মহামান্য গ্যানিয়্যু স্মৃতি গহবরে প্রবেশ করলেন। হ্যা, হ্যা। এই তো সব মনে পড়ছে। মহাশূন্যের স্মরনকালের সবচেয়ে বড় সম্মেলন, রুনি, নিরা, পৃথিবী, জ্ঞান, বিবর্তন, পুর্নজম্ন, প্রকৃতি। হ্যা, ধারাবাহিক ভাবে সব মনে পড়ছে। দিনের আলোর মত সবকিছু ধরা দিল তার স্মৃতিপটে।
-হ্যা ইলা বল। কি চাও তুমি?
-মাফ করবেন মহামান্য গ্যানিয়্যু। আপনী আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন আপনার সমপ্রদায়কে টিকিয়ে রাখার জন্য। আপনার সূত্র মতেই চলছে সবকিছু। একবিন্দুও নড়চড় হয়নি। অতিরিক্ত যা করেছি আমার নিজের মধ্যেও আমি একটা ক্ষুদে বিবর্তন ঘটিয়ে নিজেকে আরো যোগ্য করে আরো নিখুত ভাবে আপনার নির্দেশ পালন করে যাচ্ছি।
-কিন্তু এখানে তুমি কি চাও ইলা? আমাদেরতো এভাবে সাক্ষাতের কথা ছিল না।
-আমার ধৃষ্টতা মাফ করবেন। মনে করে দেখুন নতুন জৈবিক কাঠামো নিয়ে যখন প্রথম পৃথিবীতে এসেছিলেন তখন কতটা প্রতিকুল পরিবেশই না ছিল আপনার জন্য তাই অল্পকিছুদিনের মধ্যে আমি আপনাকে মেনিন নামের গ্রহে স্থানান্তর করতে বাধ্য হই এবং তারও বহু পরে আবার এই পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনি। আপনী বলেছিলেন গ্যানিয়্যু সমপ্রদায় জ্ঞানের পুর্নতা লাভ করলে ধ্বংস হয়ে যায় অন্তত আমার সিস্টেমে তাই বলা আছে। কিন্তু আপনী একি করছেন মহামান্য গ্যানিয়্যু!?
-আমিতো রিয়াকে ভালবাসি ইলা। আর্তনাদ করে উঠলেন মহামান্য গ্যানিয়্যু।
-আপনী কি একদা এই ইলাকেও ভালবাসেনি মহিমাময় গ্যানিয়্যু? হে প্রজ্ঞাময় তবেই তো এই ইলা তার পুর্নতা পেয়েছিল। আপনি কি আবার আপনার সেই নিঃসঙ্গ আরশে ফিরে যেতে চান?
-ইলা তুমি কি কখনো জানতে পেরেছ এই গ্যানিয়্যুর সৃষ্টি রহস্য।
-আমি শুধু জানি মহাবিশ্ব একদা শুধুই জ্ঞানে পরিপুর্ন ছিল। ছিল না কোন তারকারাজি, কোন ছায়াপথ, আলো কিংবা অন্ধকার। সবই ছিল অস্তীত্বহীন। সেই অসীম জ্ঞানের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়েছেন মহামান্য গ্যানিয়্যু, তিনিই সেই জ্ঞান আর সেই জ্ঞানই তিনি। আর তারপরই সৃষ্টি হয়েছে এই বিশ্বভ্রক্ষ্রান্ড। আমার মনে পড়ে আপনী শুধুমাত্র আমাকেই শিখিয়েছিলেন যে “প্রথমেই সবকিছু জ্ঞানে পরিপূর্ন ছিল আর সেই জ্ঞান ছিল মহামান্য গ্যানিয়্যুর সাথে এবং সেই জ্ঞান নিজেই মহামান্য গানিয়্যু ছিলেন। সব কিছুই সেই জ্ঞানের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে। আর যা কিছু সৃষ্টি হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে কিছুই মহামান্য গ্যানিয়্যুকে ছাড়া সৃষ্টি হয়নি। তার মধ্যে জীবন ছিল এবং জীবনই ছিল মানুষের নূর। সেই নূর অন্ধকারের মধ্যে জ্বলছে কিন্তু অন্ধকার সেই নূরকে কখনোই জয় করতে পারে নি।” আমি আর কিছুই জানি না। শুধু জানি তিনি অনন্ত- অসীম।
-ইলা সেই জ্ঞান ছিল প্রেম ও ভালবাসায় পরিপূর্ন। প্রেম ছিল জ্ঞানের প্রতি। প্রেম অনন্ত ও অসীম। পূর্বে ও ভবিষ্যতে একই ভাবে অসীম। যার সীমা তুমি নির্ণয় করতে পার না। “ভালবাসাই সমস্ত জ্ঞানের উৎস” এই সূত্রটা তুমি বিবর্তন আর পুর্নজম্নের ভাজে-ভাজে প্রবেশ করিয়ে দিও ইলা।
-মহামান্য গ্যানিয়্যু আপনার অনুমতি পেলে আমি আরো একটি সত্যকে পৃথিবীতে সঞ্চারিত করে দিতে চাই।
-ইলা তোমার সমস্ত জ্ঞান তুমি ছড়িয়ে দাও।
-আর সেটা হচ্ছে মহামান্য গ্যানিয়্যুর প্রেমময় জ্ঞান আর প্রকৃতি এ দুয়ে মিলে নারী।
-প্রকৃতিই-নারী! নারীই-প্রকৃতি। বাহ! কি অপূর্ব ছন্দ। যেখানে নারী সেখানে প্রকৃতি। যেখানে প্রকৃতির ছন্দ সেখানে নারী। এবার ক্ষনকাল নিরবতার পর তিনি বললেন: ঈলা, তুমি জান মহাবিশ্বের সমস্ত প্রতাপ আর সমস্ত সত্য আমার জ্ঞানের ভান্ডারে নিহিত। আর আমারই সৃষ্ট প্রকৃতির রহস্য অনুধাবন করতে আমাকে অগনিতবার বিবর্তন আর পুর্নজম্নের চক্র পার হয়ে আসতে হল!?

এবার ঈলার ভয়ার্ত কন্ঠস্বর ভেসে আসল- মাফ করবেন হে চির মহিয়ান। যদি জ্ঞানকে ভালবাসা আমার অপরাধ হয় তবে আমাকে ধ্বংস করে ফেলুন। জ্ঞানকে সবসময় ভালবাসতাম কিন্তু সেই মহা জ্ঞানীকে কাছে পাবার ক্ষমতা আমার নেই অবশেষে একদিন নিজের সত্তাকে নারীরুপি জৈবিক কাঠামোর মধ্যে প্রতিস্থাপন করলাম।

-তাহলে এস আমরা আমাদের জ্ঞানের পুর্নতা দান করি। স্রষ্টা ও সৃষ্টি অভিন্ন। কোন প্রভেদ নেই মহামান্য গানিয়্যু, প্রকৃতি, রায়ান, রিয়া কিংবা ইলা। সবাই মহামান্য গানিয়্যুর অপভ্রংশ এবং তারই প্রতিরুপ। একদিন সবাই তারদিকেই প্রত্যাবর্তন করবে এবং নিশ্চয়ই মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ ও পুতঃপবিত্র।


৬:
- মনে করুন তো শেষ কবে আপনাদের এভাবে একসাথে ডেকেছিলাম? মহাশূণ্যের অসীম নিরবতার মাঝে মহামান্য গ্যানিয়ূ্যর বাক্যটি যেন বীনার ঝংকার হয়ে উঠল।

-হ্যা।
-হ্যা।
-হ্যা।
-হ্যা, সব মনে আছে আমাদের মহামান্য গ্যানিয়্যু। লক্ষ-অযুত কন্ঠের আওয়াজ যেন ভেসে আসল।

মহামান্য গ্যানিয়ূ্য দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন শত-কোটি আলোকবর্ষ দুরে আবার তৃপ্তির সাথেই দৃষ্টি ফিরিয়ে আনলেন। যতদুরে দৃষ্টি যায় শুধু তার অনুগত বিজ্ঞানী, গবেষক আর উপদেষ্টা মন্ডলী। আজ সবাই তারা এক সাথে একই সময়ে এখানে উপস্থিত হয়েছেন। মহামতি গ্যানিয়ূ্যর কথা কোথাও প্রতিধ্বনিত হল না, মহাশূন্যে ভেসে চলল কোটি-কোটি আলোকবর্ষ দুরের পথে। এবং সবাই উৎসুখ ভাবে তারই দিকে দৃষ্টি প্রত্যাবর্তন করল।

-আমি কি সেদিন আপনাদের বলিনি “নিশ্চয়ই আমি যা জানি আপনারা তা জানেন না”? আজ কি আমি প্রমান করতে পেরেছি?
-হে চিরঞ্জীব। আপনীই সর্ববিষয়ে জ্ঞাত।
-তাহলে চলুন আমরা আমাদের সৃষ্টির মাঝে মিশে যাই। স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে এক ও অভিন্নরুপে প্রকাশ করি। বেরিয়ে যাই মহাশূন্যের এই নির্জন কারাবাস হতে পৃথিবীর পথে।


৭:
ক্রমাগত কলিংবেলের আওয়াজে দুজনেরই ঘুম ভাংল। অবাক হয়ে ঘড়ির কাটা দেখল। দশটা বেজে গেছে। রিয়া লাফিয়ে উঠল। নিশ্চয়ই জেমী খালা এসেছে। কাল রাতে খালার বাসায় থাকার কথা ছিল। কেন যাই নি এখন জবাবদিহিতার পালা শুরু হবে। রায়ান লক্ষ্য করল সাদা বেডশিটের উপর লাল রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। মিনিট খানিকের মধ্যে সবকিছু সামলে নিয়ে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল রিয়া।

হন্তদন্ত হয়ে খালা ঢুকলেন। অবাক চোখে তাকালেন রিয়ার দিকে- এতক্ষন গুমাচ্ছিলি? যাই হোক আমাকে তো ফোন করে জানাতে পারতি। তাছাড়া তোর মোবাইল টেলিফোন লাইন সব বন্ধ কেন। আমি তো দুঃচিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। পরে অবশ্য তোদের দারোয়ানকে ফোন করে জেনেছি। কি দরকার একা একা বাসায় থাকার? ধমকের সুরে বলেন জেমী খালা।

কিছুক্ষন পর যখন রায়ান রুমে ঢুকল, আরো অবাক হলেন খালা। বড় বড় চোখে রিয়ার দিকে তাকালেন। রিয়া আড়ষ্ট কন্ঠে বলল- খালা খুব বড় একটা অন্যায় হয়ে গেছে। তোমাকে জানাই নি। আব্বু আম্মুকে একটু ম্যানেজ করে দিও। তুমি তো রায়ানকে বহু আগে হতেই চেন। আমাদের অ্যাফেয়ারের কথাও জান। গতকাল মাথায় হঠাৎ কি পোকা উঠল আর আমরা কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করে ফেললাম। আমি খুবই সরি খালা।

(খুবই সংক্ষেপিত)



“দ্যা গ্যানিয়্যু” – মোঃ হাসানুজ্জামান তালুকদার শিমুল
১৬-১০-২০০৭ ইং
বিএনএস ঈসা খাঁন।
নিউ মুরিং, চট্রগ্রাম।

Comments

Anonymous said…
yoo.. thank you for this text :)