Tuesday

Tagged under: ,

জ্ঞানের সুউচ্চ প্রাসাদে তিনি দাউদ হায়দার নামে পরিচিত!

মাতৃভুমির মাটিতে পা রাখতে পেরে তার কষ্ট আরো সহস্র গুন বেড়ে গেল। কত যুগ ধরে যে সে স্বদেশের ভালবাসা হারিয়েছে। রাত যতই গভীর হয় তার কষ্ট তত বাড়তে থাকে। এক অজানা ব্যথায় বুকটা চৌচির হয়ে যাচ্ছে। স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে ভেসে উঠছে মা-বাবার ছবি। শৈশব কৈশোরের নরম ভালবাসাময় দিন গুলোর কথা। সে এখানে এসেছে তার শৈশব কৈশোরের কিছু বন্ধুকে খুজে পেতে যাদের সাথে সে কাটিয়েছে আনন্দঘন কত স্মৃতিময় সময়। সে দেখেছে তার অনেক বন্ধুরা আজ এদেশে প্রতিষ্ঠিত, সরকারী পক্ষের আমলা। সরকার তাদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য সবোর্চ্চ সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে।

নিজেকে প্রশ্ন করে সে, চাইলে তো তুমিও হতে পারতে এমন অগাধ ধনসম্পদের মালিক। হয়তো বা একদিন হতে পারতে মন্ত্রি-পরিষদের কেউ। দেশের সবোর্চ্চ ক্ষমতা থাকত তোমার হাতে। তোমাকে দেশের বাইরে নির্বাসিত হয়ে থাকত হত না যুগের পর যুগ।
নাহ নিজেকে প্রবোদ দেয় সে। এই সত্য সন্ধানী কবির এসবের কিছুরই দরকার নেই। সে যেমন আছে আজীবন তেমনই থেকে যাবে। পান্তা ভাত, আলু ভর্তা, কাচামরিচ আর সজনে পাতা এবং ইছামতি নদী এসব স্মৃতিই যেন তার জীবনে শ্রেষ্ঠ হিসেবে ধরা দেয়। সে তো এখনও বুড়িয়ে যায় নি তার সামনে আরও বহু সময়, সে গানের কলি গাইতে গাইতে ভ্রমন করবে জ্ঞান সমুদ্রের অনন্ত পথে। ভ্রমন করবে মহাশুন্যের অনন্ত পথে।

হ্যা। কিছুইতো বদলায় নি। এই রাস্তা, ঐ তো সেই বিশাল বটগাছটি এখনও মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে। মেহগনি আর চাম্বুল গাছের ঘন সারির মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে সরু একটি রাস্তা। তিনি হাটছেন সেই রাস্তা ধরে। দু’পাশে ছোট ছোট ঘর আর ঘরের ছাদে খেলা করছে ঝাকে ঝাকে কবুতরের দল। কিছুক্ষন পর পর কবুতরের ঝাক দল বেধে আকাশে উড়ে যায় আর শুন্যে ডিগবাজি খেয়ে আবার নেমে আসছে ঘরের চালায়। দু’পাশের বিস্তীর্ন সবুজ ধান ক্ষেতে দোল দিয়ে যাচ্ছে মৃদ্যু বাতাস। মনপ্রান ভরে স্বদেশের বাতাস বুকে টেনে নেন তিনি।

নিখুত কারুকার্য করা কাঠের পাল্লায় হাত রাখলেন তিনি। এক কিশোরী এসে দরজা খুলে কোমরে হাত দিয়ে দাড়িয়ে রইল। কিশোরীর মিষ্টি চেহারার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষন। দৃশ্যপটে ভেসে উঠল তারুন্য গাথা স্মৃতি। তার স্কুলের সামনে দিয়েই প্রতিদিন ভোরে হেটে যেত এমনি হাস্সোজ্জল এক কিশোরী। কিস্তু দুর্ভাগ্য, কখনো কথা বলতে পারেন নি। শুধু মনে মনেই ভালবেসে গিয়েছিলেন। আজও স্মৃতির অতল গহবর হতে তার জন্য ভালবাসা উথলে ওঠে।
নিজেই অবাক হন নিজেকে নিয়ে, একটুকুও বদলাননি । নিজেকে বদলাতে পারন নি। হঠাৎ মেয়েটি নিজেকে আড়াল কারার ব্যর্থ চেষ্টায় সোজা হয়ে দাড়াল। অথিতির দৃষ্টি হতে চক্ষুদ্বয় অন্যত্র সরিয়ে নিল।
কিশোরী তাকে অথিতি কক্ষে নিয়ে বসাল। কিছুক্ষন পর গৃহকর্তা আসলেন। দুজনের মাঝে পরিচয় বিনিময় হল। একসময় গৃহতকর্তা বেশ খাতির জমিয়ে তার সাথে কথা বলতে লাগলেন। অথিতি সারাদিন সেই গৃহেই থাকলেন। বিকেলে দুজন একসাথে ঘুরতে বের হলেন। মফস্বল ছেড়ে শহরে আসলেন। ছোট এক রেস্টুরেন্টে বসলেন তারা। তাদের মাঝে আলোচনায় অংশনিলেন তরুন এক সেনা অফিসার। সদ্য প্রমোশন পাওয়া আর্মি ক্যাপ্টেনের সাথে অথিতির পরিচয় করিয়ে দিলেন গৃহকর্তা। রেস্টুরেন্টের ছোট এক কেবিনে বসে তিনজন ক্ষনকালের জন্য আলোচনায় মগ্ন হলেন। অথিতি সংক্ষেপে তার কিছু অভিজ্ঞতার কথা বনর্না করতে লাগল। গৃহকর্তাও তরুন ক্যাপ্টেনকে সাথে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে অথিতির কথা শুনছেন আর তারা অপেক্ষা করছেন কখন সন্ধ্যে হবে কারন তিনি সন্ধ্যের ট্রেনেই চলে যাবেন।

আমি তো শেষ পযর্ন্ত সেই গ্রাম খুজে পেয়েছি। যেখানে মেহগনি আর চাম্বুল গাছে ঘেরা বাড়িটি এখনও টিকে আছে। আর আপনারও নিশ্চয়ই সেই বাধভাঙ্গা তরুনের কথা মনে আছে যাকে ৩৫ বছরেরও অধিক সময় আগে এই দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল।
আপনী কার কথা বলছেন। আমি বুঝতে পারছি না। ঝাঝালো কন্ঠে গৃহকর্তা প্রশ্ন করলেন।
কিছুক্ষন ‍নিরবতার পর অথিতি উত্তর দেন:
জ্ঞানের সেই সুউচ্চ প্রাসাদ জান্নাতুল ফেরদৌসে তিনি দাউদ হায়দার নামে পরিচিত।
ক্ষোভে মুখ রক্তবর্ন করলেন গৃহকর্তা। আপনী কেন সেই অপরাধীর কথা আমাকে বললেন। যে অতি অল্প বয়সেই তার বংশের সম্মান হারিয়েছে। বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল তার পুরো পরিবারকে।
কিন্তু তখন তো সে নিহাতই বাচ্চা ছেলে ছিল। সে কি কাউকে খুন করেছিল? তার কি-ই বা আর করার ছিল?
নাহ। কিন্তু সত্যি কথা এটাই, এই ছেলেটা আজ নিজের কবিতার চেয়েও মানুষ হিসেবে বেশী পরিচিত। ছাত্র বয়সেই সে খুবই জনপ্রিয় কবি হয়েছিল।যখন সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গিয়েছিল এক শিক্ষক তার নাম দাউদ জানতে পেরে তাকে প্রশ্ন করেছিল দাউদ হায়দার নামে যে এক কবি আছে তুমি জান? অল্প বয়সেই সে এতই জনপ্রিয় হয়েছিল। তার লেখনি আর কবিতা যে কোন অগ্নিবীনার মন হরন করার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু একদিন তার মাথায় এলোমেল চিন্তা বাসা বাধল। সে কবিতা লিখল ফেক সমাজ আর ধর্মের বিরুদ্ধে। তখন ক্ষিপ্ত ইসলামের কিছু ধ্বজ্জাধারী মৌলবাদীদের আস্ফালনে তাকে নিক্ষেপ করা হয় কারাগারে। পুড়িয়ে দেয়া হল তার বাড়িঘর। তারপর ১৯৭৪-এর ২২ মে, ২২ বছর বয়সী তরুণ এই কবিকে তৎকালীন রাষ্টপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিশেষ নির্দেশে কলকাতাগামী একটি ফ্লাইটে তুলে দেয়া হয়। ওই ফ্লাইটে তিনি ছাড়া আর কোনো যাত্রী ছিল না। কবির নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল সরকার।পরে নোবেল বিজয়ী কবি গুন্টার গ্রাস ত‍াকে জার্মানী নিয়ে যান। আবু আলি ইবনে সিনার* মত অল্প বয়সেই সে অতি জ্ঞানী হয়ে গিয়েছিল এবং প্রতিদানটাও সাথে সাথে পেয়েছিল। অতি সংক্ষেপে বর্ননা করলেন গৃহকর্তা।

বিচিত্র অথিতি যখন সন্ধ্যের ট্রেনে চেপে বসল। গৃহকর্তা আর তরুন আর্মি অফিসার ফিরে যাচ্ছিল নিজেদের ডেরায়। পথে যেতে যেতে তরুন অফিসারটি বলল -স্যার আমার ধারনা, মুক্ত চিন্তার যে স্বাধীন লোকটিকে দেশ হতে বিতাড়িত করা হয়েছিল সে আর কেউ নয় এই বিচিত্র লো্কটিই সে ব্যাক্তি।
বিস্ময়ে অফিসারের দিকে তাকোলেন গৃহকর্তা চুপ কর। তোমার অতি মুল্যবান চাকরীটির কথা ভুলে যাচ্ছ কেন। মাটি তোমার কথা শুনছে সে তো সবই ফাস করে দেবে।
তাই বলে চুপ করে থাকব।
হ্যা। চুপ করে থাকবে। কবির কথা কি ভুলে গেছ: “নীরবতা হল পরাক্রান্ত, বাদবাকী সবই দুর্বলতা।”**

স্যার আপনী যাই-ই বলেন না কেন। নিজেকে তো অবিশ্বাস করতে পারব না। তসলিমা নাসরিন, দাউদ হায়দার তাদের সরকার দেশে ফেরাতে চায় না কেন। আসলে ক্ষমতাসীনরা তাদের ক্ষমতা নিয়ে খুবই সন্দিহান। তারা কি ক্ষমতা হারাবার ভয় পায়। তা না হলে কেন তারা এসব বিষয়ে নিশ্চুপ। এটাই প্রমান করে ইসলামের ধ্বজ্জাধারী মৌলবাদী আস্ফালনের কাছে তারা সত্যিই কত অসহায়। মুখে যতই বলুক না কেন। আপনী দেখবেন স্যার এ দেশে যুদ্ধ-অপরাধীদের বিচার হবে না। কোন সরকারই হতে দিবে না। কারন কবির বলে গেছেন:
“আমার অধীনে এ মোর রসনা, এই খাড়া গর্দান;
মনের শিকল ছিড়েছে, (তো) পড়েছে হাতের শিকলে টান।”
***


তাছাড়া তাকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করার গোপন রহস্য আর কৌশলগুলি কি কেউ কখনো জানতে পেরেছে?

চুপ কর অফিসার। চুপ কর। সে ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল আর জানই তো যতই আমরা নিজেকে অসাম্প্রদায়িক বলি না কেন আসলে আমরা প্রচন্ড সাম্প্রদায়িক। ধর্মের প্রতি বিশ্বাস কর আর আল্লাহকে ভয় কর অফিসার।
না স্যার আপনী আমাকে বোঝাতে পারবেন না। আমি যা বিশ্বাস করি সেটা আমাকে বলতেই হবে।কাকে ভয় করার কথা বলছেন। আমি তো তাকে সর্বত্র খুজেছি কোথাও পাই নি। আসলে স্রষ্টা বলতে কিছু নেই, স্রষ্টা তাদেরই কল্পনা যারা তার নামে বেসাতি ছড়ায়।

*একাদশ শতকের বিশিষ্ট দার্শনিক ইবনে সিনা। বুখারায় জম্নগ্রহন করেন। ইউরোপে তিনি আভিৎসেন্না নামে পরিচিত। ধর্মের প্রতি অবিশ্বাস ও স্বাধীন চিন্তার দাবি জানানোর জন্য তাকে ইস্পাহানের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এবং কারাগারেই তিনি মৃত্যু বরন করেন। তিনি প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র ও অল কেমির উপর বহু বই লেখেন এবং মুসলিম প্রাচ্যে স্বাধীন চিন্তার অন্যতম পদপ্রদর্শক ও যোদ্ধারুপে পরিচিত। লাতিন ভাষায় তার অনুদিত চিকিৎসাশাস্ত্র কোষ “চিকিৎসাবিষয়ক অনুশাসন” মধ্যযুগে ইউরোপের চিকিৎসকদের প্রধান পথ প্রদর্শক হিসেবে গন্য করা হয়।

**একাদশ শতকের ফারশী কবি আবু সাইদের কাব্য হতে।

***কাজী নজরুল ইসলামের সর্বহারা কাব্যগ্রন্থের ফরিয়াদ কবিতা হতে।

ছবিঃ ইন্টারনেট হতে সংগৃহিত।

0 Comments: