Thursday

Tagged under: ,

প্রানের কবি কাজী নজরুল ইসলাম

ক্লান্ত চরনে লোকটি প্রবেশ করল বিশাল আলিশান বাড়িটিতে। আশ্চার্য হলেন এই মুহুর্তে মুল ফটকে কোন পাহারাদার নেই। কত সুন্দর একটা বাগান। অসংখ্য গাছের সমাহার তার মাঝে মনমুগ্ধকর ডুপ্লেক্স বাড়িটি। ছোট একটি গাছের ছায়ায় বসলেন। আহ্ কি সুন্দর ঠান্ডা বাতাস! মন প্রান জুড়িয়ে যায়। ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। পড়ন্ত বিকেলে গানের মৃদ্যু সুরে ঘুম ভাংল, অবাক হলেন তিনি এত সুমুধুর কন্ঠ! ভাল করে লক্ষ্য করলেন, ১৭/১৮ বছরের অপুরুপ রুপবতী মেয়ে গেয়ে চলছে

মোর ঘুম ঘোরে এলে মনোহর নমঃ নমঃ নমঃ নমঃ নমঃ নমঃ-
শ্রাবন মেঘে নাচে নটবর-
রমঝম রমঝম রমঝম-
শিয়রে বসি চুপি চুপি চুমিলে নয়ন-
মোর বিকশিল আবেশে তনু-
নিমুসম নিরুপম মনোরম-
মোর ফুল বনে ছিল যত ফুল-
ধরি ডালি দিনু ঠালি-
দেবতা মোর, দেবতা মোর, দেবতা মোর-
হায় নিলে না সে ফুল-
চিঠিবে ভূল নিলে তুলি-
খোপা খুলি কুসুম ডোল-
স্বপনে কি যে কইছি তাই গিয়াছ চলি-
জাগিয়া কেদে ডাকি দেবতায়-
প্রিয়তম, প্রিয়তম, প্রিয়তম-
মোর ঘুম ঘোরে এলে মনোহর নমঃ নমঃ নমঃ নমঃ নমঃ নমঃ-


আহ্ কি অপুরুপ কন্ঠ, অবাক হন তিনি। তিনি নিজেও বুঝি নিজের গান এত মন কাপানো সুরে গাইতে পারতেন না। আল্লাহ কি নিজ হাতে তার কন্ঠে যাদু দিয়েছেন? এসব ভাবেন আর গুটি গুটি পায়ে মেয়েটির কাছে এগিয়ে যান আগুন্তক। জনশূন্য আর দেয়াল ঘেরা ব্যাক্তিগত বাগানে অপরিচত কাউকে দেখে বিস্ময়ে চোখ কপালে তোলে কিশোরী। এত নিরাপত্তার বেষ্টনি ভেদ করে এই লোকটি ভিতরে ঢুকল কি করে। সরল দৃষ্টিতে মেয়েটির চোখে তাকায় আগুন্তক- কে তুমি মা? তোমার কন্ঠে এত যাদু!? কিছুক্ষনের মধ্যেই মেয়েটির সাথে বেশ সখ্যতা গড়ে ওঠে তাঁর। আগুন্তক বুঝতে পারেন কিশোরীটি দেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতির অথবা প্রভাবশালী কোন শিল্পপতি বা মন্ত্রীর মেয়ে। এত সুন্দর গান তুমি শিখলে কার কাছে মা মনি? এত সুন্দর কন্ঠ তোমার! আমি স্রষ্টা হলে এই কন্ঠ ফিরিয়ে নিতাম। এই কন্ঠ শুধুই আমাকে গান শোনাত। মনপ্রান খুলে মেয়েটি আগুন্তককে আপন করে নেয়। আগুন্তক জানতে পারে কিশোরী তার কন্ঠের যাদুতে দেশের সেরা সেরা পুরস্কারগুলো জয় করে নিয়েছে।
কিন্তু মামনি যদি কিছু মনে না কর আমি বলল তোমার এখনও কিছু শিখার বাকী রয়েছে। তোমার জন্য গান শেখা এখনও শেষ হয়নি। কিছু তাল-সুর-লয় ঠিক করতে হবে। কিছুক্ষন চুপ থেকে সামান্য ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মেয়েটি- আপনী জানেন আমি দেশ-বিদেশের সেরা সব গুনীজনদের কাছে শিক্ষা নিয়েছি? আপনী আমাকে ও আমার সমস্ত গুরুজনদের অপমান করছেন। গানের কি বোঝেন আপনী?

এবার সামন্য মুচকি হাসে আগুন্তক, শীতে ঠোট ফেটে গেলে আমরা যেভাবে হাসি।
তাহলে তোমাকে একটা গান শোনাই-
কন্ঠে সুর তোলে আগুন্তক-

“ভুলি কেমনে আজো যে মনে বেদনা সনে রহিল আকা।
আজো সজনী দিন রজনী সে বিনে গনি তেমনি ফাঁকা।।
আগে মন করলে চুরি, মর্মে শেষে হানলে ছুরি,
এত শঠতা এত যে ব্যাথা তবু যেন তা মধুতে মাখা।।
চকোরী দেখলে চাদে দূর হতে সই আজো কাদে,
আজো বাদলে ঝুলন ঝোলে তেমনি জলে চলে বলাকা।।
বকুলের তলায় দোদুল কাজলা মেয়ে কুড়োয় লো ফুল,
চলে নাগরী কাখে গাগরী চরন ভারী কোমর বাকা।।
তরুরা রিক্ত-পাতা, আসলো লো তাই ফুল বারতা,
ফুলেরা গলে ঝরেছে বলে ভরেছে ফলে বিটপী- শাখা।।
ডালে তোর হানলে আঘাত দিস্ রে কবি ফুল-সওগাত,
ব্যথা-মুকুলে অলি না ছুঁলে বনে কি দুলে ফুল-পতাকা।।”

আগুন্তকের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে যায় কিশোরী। দেশ বিদেশের অসংখ্য গান সে শুনেছে কিন্তু আজ একি শুনলো! একি স্বয়ং স্রষ্টা না অন্য কেউ!? মুহুর্তেই সে অনুধাবন করতে পারে এই আগুন্তক আর কেউ না তারই প্রিয় স্বপ্নের নায়ক কাজী নজরুল ইসলাম। কিশোরী লুটিয়ে পড়ে আগুন্তকের পায়ে। আমাকে মাফ করে দিন গুরুজী, আমি না জেনে আপনাকে চোখ রাঙিয়েছি। আমাকে ক্ষমা করুন।

আগুন্তক চলে যাওয়ার পর সঞ্চিত ফিরে পায় কিশোরী। কে এই আগুন্তক? কাজী নজরুল তো মারা গেছে বহু আগে। তিনি কি করে আসবেন। সময় পরিভ্রমন এও কি সম্ভব!? কিছুই বুঝতে পারে না কিশোরী।

অসম্ভব সুরেলা কন্ঠে গান শুনিয়ে গেছে আগুন্তক। কিশোরীর মনে পড়ে অতীত দিনের স্মৃতি। চৌদ্দ বছর বয়সে তার প্রেম হয়েছিল তারই এক সহপাঠীর সাথে। কত সুমধুর সেই স্মৃতি। ক্ষনে ক্ষনে আজো তা প্রতিনিয়ত মনে পড়ে। এক অজানা ব্যাথায় তার বুকটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। কিন্তু কোন ভাবেই সে তা ভুলতে পারে না। এসব স্মৃতি আজও সে বুকে ধারন করে আছে।
নিজের অজান্তেই কিশোরী গেয়ে ওঠে আগুন্তকের গানটিঃ-

“ভুলি কেমনে আজো যে মনে বেদনা সনে রহিল আকা।
- – - – - – - – - – - – - – - – - – -
এত শঠতা এত যে ব্যাথা তবু যেন তা মধুতে মাখা!”

জুলাই ১৯, ২০০৯, ঢাকা।

0 Comments: