জ্ঞানের রাজ্য The kingdom of Knowledge



("বহুদিন ধরে বহুদেশ ঘুরে দেখিতে গিয়াছি পর্বত মালা, দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু,
দেখা হয় নাই চুুু মেলিয়া,
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া,
একটি ধানের শিষের ওপর একটি শিশির বিন্দু।" -বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।)

সদ্য হাইস্কুল পাস করেছে রবিন। এখন তার লম্বা অবসর সময় যাচ্ছে। কিছুদিন পরই বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডিতে পা রাখবে। রবিনের বাবা মইনুল হক শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। সবাই তাকে মান্য করে, ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। যথেষ্ট ধনী এবং দিলদরিয়া লোক তিনি। দেশের নামী-দামী ব্যক্তিদের সাথে তার ওঠা বসা। বাবার একমাত্র সন্তান রবিন। এই অবসরে মাঝে মাঝে পুরনো পড়া গুলো ঝালাই করে নেয় আর বন্ধুদের সাথে অলস সময় কাটায়।

সূর্যটা পশ্চিমে অস্ত যাবার অপোায়, রবিনও মাত্র বাসায় ফিরেছে, ঠিক তখনই কলিং বেলটা বেজে উঠল। দরজা খুলল রবিন, সফেদ দাড়ি মন্ডিত এক বৃদ্ধ। বয়স আনুমানিক ৭৫ অথবা ৮০ বছর। এই লোককে রবিন কখনো দেখেছে বলে মনে হয় না।

রবিন সালাম বিনিময় করল। সালামের উত্তর দিলেন বৃদ্ধ।
- আহ্্ , কি সুন্দর কণ্ঠ। প্রথম দর্শনেই অতিথিকে ভাল লেগে যায় রবিনের। অতিথিকে বসতে দেয় রবিন।
- তোমার নাম কি বাবা?
- রবিন। বিনীত কন্ঠে উত্তর দেয় রবিন। আব্বুর কাছে এসেছেন নিশ্চয়ই?
- হ্যা, বাসায় নেই তোমার বাবা? আমি তোমার বাবার শিক। মইনুল যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত তখন আমি সেখানকার শিক ছিলাম।
- এখন কি আর শিকতা করেন না?
- না, সেটা ছেড়েছি বহু বছর আগে। এখন ঘুরে বেড়াই পৃথিবীময়।
- আপনী বুঝি পর্যটক? অবাক চোখে তাকায় রবিন।
- ঠিক তা নয়। তবে পৃথিবী ঘুরতে আমার ভাল লাগে। দেশ হতে দেশান্তরে ঘুরে না বেড়ালে জ্ঞানের যে অসীম ভান্ডার, সেটার খোজ পেতাম কিভাবে? পৃথিবীর পথে পথে যে মুক্তো ছড়িয়ে আছে সেটা তো আমাদেরই কুড়াতে হবে। ঘরের কোনে বসে থাকলে কি চলবে? আল্লাহ পাক আমাদের সৃষ্টি করেছেন কেন? তার বিশ্বভ্র্রান্ডে যে অসীম জ্ঞান তিনি ছড়িয়ে রেখেছেন, সেই জ্ঞান অজর্নইতো আমাদের জীবনের মূল ল্য হওয়া উচিত। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের বিখ্যাত কবিতাটি পড়নি "থাকবনাক বদ্ধঘরে/ দেখব এবার জগৎটাকে/ কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘুর্নিপাকে/... কেমন করে জলডুবুরি সিন্ধু সেচে মুক্তো আনে।
- কিন্তু আংকেল, এখন তো ইন্টারনেটের যুগ ঘরে বসে নিমেষেই পৃথিবীর সব খবর পাওয়া যায়।
- হ্যা, এখন তো ইন্টারনেটের বদৌলতে ঘরের কোনে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিও লাভ করা যায় । কিন্তু সে শিা সমপূর্ণ বাস্তবতা বর্জিত। আসলে সে পৃথিবীর কিছুই জানে না। জানতে হলে পৃথিবী চষে বেড়াতে হবে আর মিশতে হবে সর্বস্তরের মানুষের সাথে।

এমন সময় রবিনের মা ক েপ্রবেশ করলেন। হতবাক হয়ে যান তিনি- স্যার আপনি? কখন এলেন, আমাদের বাসার খোঁজইবা আপনাকে কে দিল?
দীর্ঘ সময় পর হলেও রবিনের মা মনোয়ারাকে চিনতে পারেন বৃদ্ধ। বিশবছর বয়সে এই মেয়েটিকে ভালবেসেছিল তার প্রিয় ছাত্র মইনুল।
- ভাল আছ মনোয়ারা?
- স্যার আপনার শরীর কেমন? শুনেছি বহু আগে আপনি চাকরী ছেড়ে দিয়েছেন। সবাই বলছিল আমেরিকার ও রাশিয়ার দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার অফার পেয়েছিলেন।
- সেটা পেয়েছিলাম বৈকি, কিন্তু আমার তো আর একঘেয়ে জীবন ভাল লাগছিল না, তাই পৃথিবী ভ্রমনে বেরিয়ে পড়লাম। বিশ বছর যাবৎ ঘুরলাম পৃথিবীর পথে পথে।
- কিন্তু স্যার এত টাকা? অবাক হয় মনোয়ারা।
- হুম। মানুষের ভালবাসার অসীম ভান্ডারের খোজ কি কখনোই পেতাম, যদি পথে না বেরোতাম? প্রেম আর জ্ঞানের সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে এই পৃথিবী, কিন্তু আমরা এতই মূর্খ যে যার বিন্দু মাত্রও স্পর্শ করতে পারছি না। শুধু ডুবে আছি অলীক লোভে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে বৃদ্ধ। তুমি বরং দেখ আমার জন্য চা-কফি বানাতে পার কিনা।
- স্যার আপনি বসুন, আমি আপনার জন্য নাস্তা পানির ব্যবস্থা করছি। দ্রুত পদে বের হয়ে যায় মনোয়ারা।
আবার রবিনের দিকে তাকালেন বৃদ্ধ - বৎস দেশে তো অনেকদিন পড়ালেখা করেছ এবার বহিঃবিশ্ব ঘুরে আস। পুরো পৃথিবী না হোক, পৃথিবীর ুদে একটা অংশতো দেখা হবে আর তোমার পড়ালেখাও হয়ে যাবে। দেখবে ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতা, ভিন্ মানুষ, ভিন্ন তাদের সংস্কৃতি, খুজে পাবে মানুষের ভালবাসা আর জ্ঞানের অসীম ভান্ডার, সেখান হতে মুঠোভরে যা নিতে পার সেটাই তোমার লাভ, কেউ তোমাকে বাধা দেবে না। আর দেখবে এই পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষই ভালবাসার জন্য কতটা কাঙ্গাল, কেউ সেটা প্রকাশ করে, কেউ নিরবে কাঁদে। যদি মানুষের মাঝে মিশে যেতে পার তবে দেখবে পৃথিবীর সবের্াচ্চ ধনী অথবা মতাশালী ব্যাক্তিও সামান্য একটু ভালবাসা পাবার জন্য কেমন মরিয়া হয়ে থাকে।

রবিনের শরীরের লোম গুলো কেমন যেন শিরশির করছে। অনুভব করছে ওর মধ্যে দ্রুত চিন্তার পরিবর্তন হচ্ছে। সে যেন জ্ঞানের রাজ্যের সন্ধান পেয়েছে।
- আংকেল আমারও ইচ্ছে আছে পড়ালেখার জন্য বিদেশ যাব। আচ্ছা বলুন তো কোথায় গেলে ভাল হয়?
- এক সময় জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু ছিল গ্রীস, মিশর, রোমান, চীন আর খোলায়ফা হারুন-অল-রশিদের বাগদাদ নগরী। তখনকার দিনে সারা পৃথিবীর জ্ঞানপিপাসু মানুষরা সেসব দেশে যেত। আর এখন সারা পৃথিবীর বুকে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে আমেরিকা, মার্কিন মুলুক। শৌর্য-বির্য্যে, মতায়, জ্ঞানে, শিা, সংস্কৃতি, সভ্যতা সর্বেেত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট এগিয়ে। পৃথিবীর নামিদামি শিা প্রতিষ্ঠান, সবের্াচ্চ জ্ঞানী ব্যক্তিরা এখন সেখানে বাস করেন। তোমার যদি পড়ালেখার জন্য বিদেশে যেতেই হয় তবে মার্কিন মুলুকেই যাওয়া উচিত। তোমার জ্ঞান আর চিন্তার সুতোগুলি দেখবে শুধু খুলতে শুরু করেছে। আর যদি নারী প্রেমিকও হও তবে দেখবে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, ক্যালিফোর্নিয়া সহ প্রত্যেক শহরের অলিতে গলিতে ভুবন মাতানো অস্পরীদের চলাফেরা, তাদের নেই কোন সংকোচ, কোন হীনমন্যতা, কোন অহংকার তুমি চাইলে খুব সহজেই তাদের বন্ধু করে নিতে পারবে। জ্ঞান অর্জনের পথে প্রধান অন্তরায় 'নারী পুরুষের ব্যবধান' ওরা ঘুচিয়ে ফেলেছে বহু আগে।
- কিন্তু আংকেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট নিয়ে তো অনেক কুকথা প্রচলিত আছে, ওরা নাকি যুদ্ধপ্রিয়, নাস্তিক ইত্যাদি ইত্যাদি।
- রবিন, ভীরুরা সব সময় বলে ওই পথে যেও না, সেখানে আছে কাটাভরা পথ। ওখানে আছে মৃতু্য, বিভীষিকা আর গাঢ় অন্ধকার কিন্তু প্রকৃতপ েসেটাই আলোকিত পথ। নজরুল কি বলেছেন জান "দুরন্ত পথিক কখনো সত্যকে ভয় পায় না বরং সত্যকে মেনে নেওয়াই তার ব্রত। যে প্রকৃত সত্যকে সহজেই মেনে নিতে পারে সে-ই প্রকৃত তরুন।" যাদের ধার করা জ্ঞানে পুরো বিশ্বচলছে সেখানে কি সন্দেহের কোন অবকাশ আছে। দেখ, তোমার শিার কারিকুলাম, তোমার দৈনন্দিন ব্যবহারিক সমস্ত কিছুর প্রযুক্তিই ওদের কাছ হতে ধার করা। তাদের ধার করা জ্ঞানে তুমি আজ শিতি হয়ে তাদেরই বদনাম করছো? এটা যারা করে, তারা ভীতু, তারা সত্যকে মেনে নিতে ভয় পায়। মিথ্যাকে আকড়ে থাকলে কখনোই তুমি প্রকৃত শিালয়ে যেতে পারবে না আর অর্জন করতে পারবে না প্রকৃত জ্ঞান। আর যদি তুমি প্রকৃত সত্য মেনে নিতে পার তবে ওদের আর তোমার বলে কোন পার্থক্য থাকবে না, সবই হবে তোমার সংস্কৃতি, তোমার সভ্যতা, তোমার প্রযুক্তি। "এক পৃথিবীর মানুষ আমরা সংস্কৃতি নয় অপ"। তবে বহিঃবিশ্বকে জানার মাধ্যমে এটাও তুমি বুঝতে পারবে যে, মাতৃভূমির সৌন্দর্যই প্রত্যেকের কাছে সেরা। বলতে বলতে ঘেমে ওঠেন বৃদ্ধ।

রবিন তন্ময় হয়ে লোকটির কথা শুনে আর ওর হাজারো প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে কান্ত হয়ে যান বৃদ্ধ। রবিনের মা বিরক্ত হন রবিনের বাড়াবাড়ি দেখে।
- ওকে বাধা দিও না মনোয়ারা। ওকে ওর জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশ করতে দাও। শীতল কন্ঠে বলেন বৃদ্ধ।
রাত প্রায় আটটা পর্যন্ত দুজনে গল্প করে। রবিনের বাবা আজ বাসায় ফিরবেন না। অফিসের কাজে চট্রগ্রাম চলে গেছেন। বাধ্য হয়ে তার সাথে দেখ না করেই লোকটিকে ফিরে যেতে হচ্ছে।
- আংকেল, বাবার সাথে দেখা না করেই যে চলে যাচ্ছেন?
- তোমার বাবা তো আজ ফিরবে না। আগামীকাল সন্ধ্যেয় আবার আসব। তখন তোমার বাবা থাকবেন নিশ্চয়ই, অবশ্যই ফোন করে আসব।
- তখন বাবা না থাকলেও আসবেন। আমার সাথে গল্প করবেন।

সেদিনের মত অতিথি চলে যান। রবিন তাকে রাস্তাধরে বেশ কিছুদুর এগিয়ে দেয়। বাসায় ফিরেই রবিনের মন অসত্দির হয়ে ওঠে।
পরদিন বিকেলে আর বাসার বাইরে বের হয় না রবিন কারণ তিনি আসার পুর্বে ফোন করবেন বলেছেন। বাবা বাসায় আছে তিনি নিশ্চয়ই বাবাকে ফোন করে বলেছেন আসবেন। কিন্তু বিকেল গড়িয়ে রাত নামে অতিথি আর আসে না। রবিন বাবাকে জ্ঞিগেস করে, বাবাও কিছু জানে না। তাহলে তার অজানা প্রশ্নের উত্তর দিবে কে? এক-দুই-তিন দিন পেরিয়ে যায়, তিনি আর আসেন না। কোন ঠিকানাও তিনি দিয়ে যাননি।

এভাবে প্রায় এক মাস পেরিয়ে যায় অতিথি আর আসেন না কিন্তু তার প্রত্যেকটি কথা রবিনের অন্তরে গেথে আছে।

যত দিন যায় তত অস্থির হয়ে ওঠে রবিনের মন, তাকে এখানে পড়ে থাকলে চলবে কেন। তাকে যেতে হবে জ্ঞানের রাজ্যে, তাই জ্ঞানের রহস্য উন্মোচনের ল্যে রবিন একদিন পাড়ি জমায় বৃদ্ধ-জ্ঞানীর নির্দেশিত আধুনিক জ্ঞানের রাজ্য মার্কিন মুলুকে।

Comments