প্রতিশোধ : The Revenge


“অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহবান,
প্রানের প্রথম জাগরনে তুমি বৃক্ষ আদিপ্রান।” - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
[১]
তার চোখ নেই কিন্তু সে দেখছে। দেখছে, অনুভব করছে সবকিছু। সে দেখছে দিনদিন তার বংশধররা, তার প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আগে এই বিলুপ্তির ধারা ছিল ধীরে ধীরে কিন্তু এখন দিন দিন সেটা দ্রত হতে দ্রুততর হচ্ছে,। আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে সমস্যাটা। কিন্তু সে কিছুই করতে পারছে না। শুধু চাপা কষ্ট আর দুঃখ বয়ে বেড়াচ্ছে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এই প্রাণীগুলো কত নিষ্ঠুর, কত অকৃতজ্ঞ। তারা নিজের আশ্রয় দাতাকে ভূলে যাচ্ছে, ভূলে যাচ্ছে পালনকর্তা, অন্নদাতাকে। সে স্মৃতি হাতড়ে চলে গেল সেই টারসিয়ারী যুগে, জুরাসিক যুগে। মহাকালের ভাজে ভাজে খুজে দেখল। হ্যা, এইতো ধারাবাহিক ভাবে সব মনে পড়েছে। এই সুন্দর গ্রহ, বিশ্বভ্রক্ষান্ডের একমাত্র প্রাণ সমৃদ্ধ গ্রহ, এটা তো একদা আমাদেরই রাজত্বে ছিল। শুধু আমরাই ছিলাম। যেদিকে দৃষ্টি যেত শুধূ সবুজ আর সবুজ আর ছিল সাগরের নীলাভ পানি। সেই পানির নিচেও আমাদের বংশধরদের রাজত্ব ছিল। আসমান ছোয়া বৃক্ষগুলি প্রতিদিন খেলা করত মেঘবালিকার সাথে। মেঘবালিকা কত ভালবাসতো তাকে, দান করত অমৃত জলধারা আর পূর্বে উদিত সে নক্ষত্র শীতল রাখত মায়ের আচল। কথা হত মেঘবালিকা,সূর্য আর রাতের চাদ কিংবা তারার সাথে। মেঘ আর সূর্য প্রায়ই একে অপরকে সহ্য করতে পারত না। যখন মেঘকে নিমন্ত্রম করতাম, অভিমানে সূর্য তখন লুকিয়ে পড়ত কিংবা যখন সূর্যকে নিমন্ত্রম করতাম তখন অভিমানে মেঘ ডানা মেলে উড়ে যেত। কিন্তু তারকারাজি এবং চাদ ছিল একে অপরের ভাল বন্ধু, প্রতি রাতে তারা আমায় ডাকত। আমিও নেচে গেয়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানাতাম। কিন্তু এখন ওরা সবাই আমার শত্রু হয়ে যাচ্ছে এই নিষ্ঠুর প্রাণীগুলোর জন্য। মেঘবালিকা এখন আর আমার ডাকে সাড়া দেয় না, সূর্য কষ্ট দেয় আমার জননীকে। কত সাত-পাচ ভাবে, কিন্তু অতীতকে সে বিষন্ন করে তুলতে চায় না।

স্মৃতির পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় পাঠ করে সে- হ্যা এই তো পাওয়া গেছে। কত যত্নে আমি ওদের আগলে রেখেছিলাম, আশ্রয় দিয়েছি আচল তলে, অন্ন দিয়ে বাচিয়ে রেখেছি প্রাকৃতিক বিপর্যয় আর স্রষ্টার অভিশাপ হতে। এরা কত অসহায় ছিল, আমিইতো এদের লুকিয়ে লুকিয়ে রাখতাম শত্রুর আক্রমন হতে। নাহ্ এরা বড় অকৃতজ্ঞ, এরা মানুষ, এরা নিশ্চয়ই বড় অকৃতজ্ঞ জাতি, এরাতো নিজেরাই একে অপরকে ধ্বংস করে ফেলছে। এটা পৃথিবী, অপূর্ব সুন্দর আর চিরকল্যানময়। এখানে এমন অকৃতজ্ঞদের বাস করার কোন অধিকার নেই, এরা খুবই কুৎসিত জাতি। আর নাহ, কিছুতেই ওদের এই অসৎ উদ্দেশ্য সহ্য করা হবে না। তীব্র প্রতিশোধের নেশায় জ্বলে ওঠে সে। ওরা কি নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যাবে না কি আমাকেই প্রতিশোধ নিতে হবে? কিন্তু এখনও তো আমি ওদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন তবে কেন আমাকে ওরা ধ্বংস করে দিতে চায়? ওরা কি বুঝতে পারছে না যে, আমি অস্থিত্বহীন হয়ে পড়লে ওরাও অস্থিত্বহীন হয়ে পড়বে?
অবশেষে এই রহস্যের উৎঘাটন করল সে- নাহ্ , আমার ধ্বংসের পরও ওরা ধ্বংস হবে না। ওরা টিকে থাকবে আরো কোটি-কোটি বছর, মানব সভ্যতার বিজ্ঞানের অগ্রগতি তাদের সমস্ত মুল্যবোধের বিকাশকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ওরা জীবিকা আর খাদ্যের অন্বেষণনে চলে যাচ্ছে মাটির তলদেশে, সমুদ্রের গভীরে। আমার বিলুপ্তির পর ওরা ভূগর্ভের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং ততদিনে ওরা নিশ্চয়ই বেচে থাকার একটা অবলম্বন পেয়ে যাবে। ওরা প্রস্তুত করবে কৃত্রিম খাদ্য, এমন কি মাটিস্থ প্রোটিন বের করে ওরা খাদ্য তৈরী করবে, তবুও ওরা আমাকে বাচতে দেবে না। এরই মধ্যে আমাকে প্রতিশোধ নিতে হবে। প্রতিশোধের নেশায় হিস হিস করে ওঠে সে। এক প্রকার হিংস্র বাতাস গাছের শাখাগুলোকে যেন দুমড়ে মুচড়ে ফেলছে।

এই পৃথিবীতে আমিই প্রথম এসেছি, প্রানের স্পন্দন ঘটিয়েছি আর ওরা কিনা আমাকেই মেরে ফেলতে চায়? ক্ষোভের সাথে মানুষ গুলোর দিকে তাকায় সে- কেমন বিশ্রী শব্দ করে, কেমন কুৎসিত কাঠামো আর কেমন গর্বভরে পৃথিবী প্রকম্পিত করে? যেমন রুক্ষ তাদের চেহারা তেমন রুক্ষ তাদের ব্যবহার । কান্না আসে তার- এমন অকৃতজ্ঞদের আমি কোটি-কোটি বছর লালন করেছি? বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তার।
নাহ্ , আমাকে বাচতেই হবে। জীবনের স্পন্দনে আমিইতো প্রথম প্রান। আমিইতো এতদিন আশ্রয় দিয়ে সবাইকে টিকিয়ে রেখেছি আর আজ আমিই এখানে থাকতে পারব না? তা হয় না, এই পৃথিবী আমার। অঝোর ধারায় কাদছে সে।
পৃথিবীর কোটি কোটি বছরের ইতিহাস পাঠ করল সে, প্রানের সমস্ত রহস্য নিংড়ে বের করে আনল। সমস্ত রহস্যের সমাধান দেওয়া আছে সেখানে। দেওয়া আছে শত্রুকে ধ্বংস করার কৌশল, আত্মরক্ষার উপায়। সব, সব আছে সেখানে। সে সমাধান খুজে পায়- তাকে মরতে হবে। বাচতে হলে মরতে হবে, তবে মরার আগে মরতে হবে- হ্যা, এই তো পেয়ে গেছি । এতদিনে এই মানুষগুলিকে একটা উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পারব, যেন ভবিষ্যতে কোন প্রজাতি নিজেদের মানুষ দাবি করতে লজ্জা পায়। আমি সেই ব্যবস্থাই করব।

হঠাৎ এক টুকরো মেঘ ওর মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায়। কান্না জড়িত কন্ঠে সে ডাক দেয়- মেঘ ভাই, কই যাও? একটু দাড়াও না। কতদিন তোমায় দেখি না। আমার কষ্ট হয় না বুঝি? অভিমান ঝরে পড়ে তার। পরিচিত কণ্ঠ পেয়ে থমকে দাড়ায় মেঘ- কি করব বোন? তোমরা নেই তাই এখন আর পৃথিবীময় ঘোরার ইচ্ছে জাগে না। সূর্যটা যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ে তখন সে ডাক দেয়- সূর্যি মামা, আজ আমার সাথে কথা বলনি কেন?
-তোমায় বিষন্ন দেখে কষ্ট হয়, মেঘবালিকা আর আগের মত আসে না, তাই তোমার কষ্ট আর বাড়াতে চাই না। কষ্ট চেপে রেখে বলে সূর্যি মামা ।
সন্ধ্যার পর একটুকরো বাতাস যখন তাকে পরশ বুলিয়ে যায়, সে ডাক দেয়- ও ভাই, দিনের শেষে এলে তাও ক্ষনিকের জন্য। দাড়াও না ভাই, কিছু কথা বলি।
সে বুঝতে পারছে, দিনদিন সবাই দূরে সরে যাচ্ছে, প্রিয়জনরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এভাবে আর চলতে দেয়া যায় না । প্রতিশোধ নিতে হবে, চরম প্রতিশোধ। থরথর করে কেপে ওঠে সে।

[২]
তখনও শেষ বিকেলের আলো ফুরিয়ে যায় নি, অন্যসব দিনের মতই চলছে সবার কাজকর্ম। ব্যস্ত তরুন-তরুনীরা বিপনী বিতান গুলোতে কেনাকাটায় ব্যস্ত, কেউবা হাটছে পার্কে, মাঠে অথবা নদীর ধারে। সারাদিনের অফিস শেষে সবাই ঘরে ফিরছে। কারো মধ্যে দুঃচিন্তার ছাপ নেই। সবার মধ্যে একই কথা ‘শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না।’ টেলিভিশনে কিছুক্ষন পর-পরই প্রচার করা হচ্ছে ভয়াবহ ভবিষ্যৎবানী। বিজ্ঞানীরা আগত সাইক্লোনটির নাম দিয়েছেন ‘রিভেনজ’ (Revenge)। প্রতিটি বেতার কেন্দ্র হতে ঘোষনা করা হচ্ছে সমুদ্রের মাঝিরা যেন সন্ধ্যের পূর্বেই ফিরে আসে। কেউ-কেউ ফিরল, কেউ ফিরল না। উপকূলীয় এলাকা গুলোতে পুলিশ আর সামরিক বাহিনীর লোকজন গিয়ে মাইকিং করছে কিন্তু কারো আগ্রহ নেই সাইক্লোন শেল্টার স্টেশন গুলোতে যাওয়ার, একপ্রকার বাধ্য করেই সবাইকে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। সন্ধ্যের সাথে সাথেই আকাশে জমে উঠল কালো মেঘ। অনেকে উৎকণ্ঠায় তাকালো আকাশে। অভিজ্ঞতার আলোকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের আর বুঝতে বাকি রইল না এ কিসের আলামত, এ যে মত্যুর পরওয়ানা নিয়ে আসছে মৃ্ত্যুদূত ‘রিভেনজ’ (Revenge) । দশ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের তাৎপর্য এবার কেউ-কেউ কিছুটা অনুভব করছে। সবাই ছুটছে দ্বিগ্ববিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে। ছুটছে আশ্রয়ের আশায়, ছুটছে বেচে থাকার আশায়। বহন যোগ্য সম্বলটুকু কাপড়ে বেধে ওরা ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসল। চোখের জল ফেলতে-ফেলতে মুক্ত করে দিল গবাদি পশু-পাখিদের।
রাত নামার সাথে-সাথেই সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠল, বাতাসের গতিবেগ ক্রমেই বাড়ছে। রাত্রির প্রথম প্রহরেই আঘাত হানল প্রলয়ংকরী সাইক্লোন ‘রিভেনজ্’ (Revenge) । প্রায় পাচশত কিলোমিটার বেগে ঝড়টি আঘাত হানল সারা রাত্রি ধরে। লন্ড-ভন্ড করে দিল কোটি-কোটি মানুষের ঘর-বাড়ি, ফসলের ক্ষেত , সন্তান-সন্ততি আর গবাদি পশু-পাখি।
সকাল হল। আকাশে বাতাসে শুধু মানুষের চিৎকার আর হাহাকার। স্বজন হারানোর কান্নায় পৃথিবীর আকাশ ভারী হয়ে উঠল। পৃথিবীর বাতাসে শুধুই লাশের গন্ধ। এখন শুধুই বেচে থাকার আকুতি। চাই খাদ্য আর পানি। পর্যাপ্ত ত্রাণ।। কিন্তু কে দেবে তাদের সাহায্য। রাস্তাঘাট সব বিধ্বস্ত , স্থল যোগাযোগের কোন উপায় নেই, রাস্তার উপর ভেঙ্গে পড়ে আছে শতবর্ষী গাছগুলোও। চারিদিকে লক্ষ-লক্ষ মানুষের লাশ আর লাশ, লাশের মিছিলে মানবতা খুজে পাওয়া ভার। সবার চোখে মুখে উৎকণ্ঠা, প্রকৃতি এ কি নিষ্ঠুর খেলা খেলল মানুষের জীবন নিয়ে, প্রকৃতি এ কেমন প্রতিশোধের নেশায় মেতে উঠল?

[৩]
বিস্তীর্ন ধান ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে করিম মিয়া। এক দাগে দশ একর জমি তার । গত বছরও এখানে ছিল সুউচ্চ গাছের সমাহার। মৃত্যুর সময় বাবা বলেছিল একসাথে যেন সব উজাড় না করে আর অবশ্যই যেন নতুন গাছ লাগায়। একদিন শহরের এক পার্টি আসে, চড়া দাম হাকে। কাচা টাকার গন্ধ পেয়ে করিম মিযা সব গাছই বিক্রি করে দেয়। সে এখন কোটি টাকার মালিক, এলাকার সবচেয়ে বড় ধনী। প্রতিবেশীরা বলেছিল আবার গাছ লাগাতে। কিন্তু আবার পনের, বিশ বছর। নাহ্ , বাকীতে বিশ্বাসী নয় করিম মিয়া। তার চাই কাচা টাকা, নগদ টাকা। সে ধান আবদ করে, বছর না ঘুরতেই আসবে টাকা, করিম মিয়া উঠোনে বসে ভাবে আর পান চিবোয়। কিন্তু এখন যেন তার কান্না আসছে, দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বাড়ন্ত ধানের চারা গুলি কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে। যত্মতো কম হচ্ছে না, নিজের মেশিন, পর্যাপ্ত পানি, সার, তবুও চারা গুলি দিনিদিন শুকিয়ে যাচ্ছে। করিম মিয়া ছুটে যায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছে। উপজেলা কৃষি অফিসারসহ সবাই সরেজমিনে পরিদর্শন করল।

কয়েক বছরের মধ্যেই কৃষি মন্ত্রনালয়ে জমা পড়ে হাজার হাজার প্রতিবেদন। নির্দিষ্ট কোন কারণ খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। সবর্ত্র একই অবস্থা। প্রকৃত কারণ খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই হতাশ। এভাবে কেটে গেল বহু বছর।

[৪]
লম্বা কাঠের টেবিলের এক প্রান্তে বসে আছেন মাননীয় মিরান। সম্মেলন কক্ষের সবাই নিরব। কথা সরছে না কারো মুখে। তিনি তাকিয়ে আছেন টেবিলটির দিকে আর ভাবছেন , এই টেবিলটা তৈরি করতে কত ব্যয় হয়েছিল? অনেক, অনেক টাকা, একটা কৃত্রিম বন তৈরী করা যেত। অথচ কত বিলাসিতা করা হয়েছিল, হেলিকপ্টারে করে সেই আমাজান হতে দূর্লভ প্রজাতির এই গাছ সংগ্রহ করা হয়েছিল।
নিরবতা ভঙ্গ করল একজন পরিবেশবিদ- স্যার নি:সন্দেহে আমরা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছি।
-ডাইনোসর ছিল নির্বোধ প্রাণী। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে তাই তারা হারিয়ে গেছে। হেরে গেছে। কিন্তু আমরা? আমরা মানুষ। সৃষ্টির সেরা জীব। আমরাও হেরে যাব প্রকৃতির কাছে? মাঠের ঘাস শুকিযে মাটি বের হয়ে এসেছে। শহর ছেড়ে বেরুলেই শুধু ধু-ধু মরুভূমি আর পোড়া মাঠ। সবুজের চিহ্ন মাত্র নেই। পৃথিবীতে এটা কি হচ্ছে? উপকূলীয় সবদেশগুলো পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের উচ্চতা দিন-দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মারাত্মক ভাবে গলে গেছে এন্টার্কটিকার বরফ। সবচেয়ে করুন হচ্ছে অনুন্নত আর উন্নয়নশীল দেশগুলো, দুর্ভিক্ষ আর গৃহ যুদ্ধের কবলে পড়ে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ছে। এখনও যারা টিকে আছে শুধু তাদের মজুদ খাদ্যের জোরেই। কেউ কাউকে সাহায্য করছে না। উপরন্তু এক জাতি তাতারি কিংবা বেদুইনদের মত অন্য জাতির উপর হামলে পড়ছে। সমুদ্রের গর্ভে খাদ্য হিসেবে যা ছিল তাও দিন দিন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সমস্ত উদ্ভিদও মরে গেছে। পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। অথচ এখানে উপস্থিত আছেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আর মহাজ্ঞানীরা, যারা বলতে পারেন মহাবিশ্ব কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, পৃথিবীর বয়স কত, মঙ্গল গ্রহের মাটিতে কি কি উপাদান আছে। কিন্তু এখন, কি কাজে আসবে তাদের সেই জ্ঞান যদি আমরাই টিকে না থাকি। মহাবিশ্বে পৃথিবীই তো একমাত্র মানুষের বসবাস উপযোগী গ্রহ তাহলে এই পৃথিবী ছেড়ে আমরা যাবো কোথায়, কি খাব, কিভাবে বাচবো? গত সম্মেলনে আপনারা আমাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা অত্যাধিক প্রোটিন সমৃদ্ধ এক প্রকার রাসায়নিক খাদ্য তৈরী করতে সক্ষম হবেন, কিন্তু এখনও তার কোন অগ্রগতি নেই। অথচ প্রতিদিন পথে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে মৃত লাশ। পৃথিবীর আবহাওয়া বিষাক্ত হয়ে উঠছে, কিন্তু আপনারা কিছুই করতে পারছেন না অথচ এক সময় সবাই গর্বভরে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়িয়েছেন যেন আপনাদের পদভারেই ধন্য ছিল পৃথিবী। ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ। লজ্জা, লজ্জা, এটা মানব জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ লজ্জার বিষয়।
ক্ষোভের সহিত মুখ বিকৃত করলেন ড. মিরান।

- আজ এখানে সবাই অপরাধী। সবার অবনত মস্তক। আজ নেই কারো অহংকার কিংবা গর্ব। আজ কেউ কারো নয়।। একদা যে বলত আমিই মঙ্গলে প্রথম পদচারী ব্যক্তি, আমিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী কিংবা শ্রেষ্ঠ ক্ষমতাধর, আমি কৃত্রিম মানব তৈরীর গুপ্ত রহস্য জেনেছি, মানব সভ্যতা ধ্বংসকারী পারমানবিক অস্ত্র ও ন্যানোমাইন তৈরীর গুপ্ত রহস্য আমি জেনেছি। আজ কোথায় তারা? আজ কথা সরছে না কারো মুখে। আচ্ছা চিন্তা করুন আগামীকাল যখন খাদ্য ফুরিয়ে আসবে, কি করবেন? আপনাদের মধ্যে কি এমন একজন মাত্র ব্যক্তি নেই যিনি এর সমাধান দিতে পারবেন। একজন, শুধু একজন। কান্নাজড়িত কন্ঠে থরথর করে কেপে উঠলেন বৃদ্ধ মিরান। আপনাদের অনভূতি কি ভোতা হয়ে গেছে? বুঝতে পারছেন তো পৃথিবী তথা মহাবিশ্ব হতে মানব সভ্যতার বিলুপ্তি ঘটতে যাচ্ছে? কেউ একজন কথা বলুন। আপনাদের আমি পৃথিবীর ঐসব শোষিত নিরক্ত মানুষের কসম দিয়ে বলছি যাদের অর্থে আপনারা উন্নত জাতির মহাজ্ঞানী উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। কেউ নেই। আজ যারা জীবিত তারাও মৃত। আপনারা সবাই শুধু ধ্বংসের ফর্মুলা মন্থন করে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ হয়েছেন, কিন্তু সৃষ্টির সুতোটা কেউ ধরতে পারেন নি, এমন কি কেউই রক্ষনাবেক্ষন প্রক্রিয়াটুকুও দেখাতে পারেন নি।

পুরো সম্মেলন কক্ষে থমথমে নিরবতা।
-আচ্ছা কেউ যেহেতু পারছেন না তাহলে আমিই একটা সমাধান দিচ্ছি। কাপা কাপা কন্ঠে বলতে লাগলেন ড. মিরান। এই দেশে এখন আমরা যারা টিকে আছি তাদের জন্য প্রায় দশ বছরের খাদ্য মজুদ আছে।
সবাই অবাক হল, একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল।
-অবাক হবেন না। এটা ছিল অতি গোপনীয়, যা শুধু জানতাম আমি আর মুষ্টিমেয় বিশ্বত্ব লোকজন। আরো আছে বেশ কিছু ওষুধ পত্র। কিন্তু পৃথিবীর আবহাওয়া বিষাক্ত হয়ে গেছে। এ আবহাওয়ায় আমরা আরো দুটো বছরও টিকতে পারব না । তার চেয়ে এই ভাল , আমাদের নিকটবর্তী যে দুটো দেশের কিছু মানুষ এখনও টিকে আছে তাদের মাঝে কিছুটা খাদ্য বিলিয়ে দেই যেন তারাও আরো কিছুদিন বেশী বাচতে পারে, নতুবা দু’মাস পরেই ওদের খাদ্যও ফুরিয়ে যাবে।
আর্তনাদ করে উঠল সবাই- নাহ, মহামান্য মিরান, নাহ। নাহ! আমরা অবশ্যই খাদ্য ফুরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত বেচে থাকার চেষ্টা করব। আমরা কিছুতেই সেটা করতে দেব না। প্রতিবাদ করল জর্জ রর্বাটসন।
তরুন বিজ্ঞানীর দিকে তাকালেন মিরান – না রর্বাট, আমি কারো পরামর্শ ছাড়া কিছুই করি নি এবং করব না। সবার মত আমিও আশাবাদী।
সেদিনের মত আলোচনা শেষ হল কোন প্রকার সমাধান ছাড়াই।

ধীর পদক্ষেপে হাটছেন মিরান। কখনো সমুদ্রের বেলাভূমিতে, কখনো খোলা মাঠে অলস সময় কাটান। বড়-বড় অট্রালিকাগুলোর দিকে তাকিয়ে নিরবে চোখের জল ফেলেন। ওগুলো এখন সব অভিশপ্ত। জেটিতে বাধা বিশালাকার জাহাজগুলো ফাকা পড়ে আছে। এয়ার ক্রাফট কেরিয়ারগুলোর উপর শতশত যুদ্ধ বিমান, সবই এখন নিশ্চল। পৃথিবীতে বিজ্ঞানের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল শুধূ মানুষ হত্যা করার জন্য। শতশত বন উজাড় করে তৈরী করা হয়েছিল সামরিক ঘাটি, পারমানবিক স্থাপনা। অধিকাংশ ভূমি কিংবা বনভূমি গুলো দখল করে রাখত সামরিক বাহিনীরা। সরকার সর্বোচ্চ অর্থ ব্যয় করতো যুদ্ধ খাতে। অথচ কেউ ভাবেনি পরিবেশ নিয়ে। পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসেনি কেউ। আজ কোথায় তারা যারা মানুষ হত্যা করে তৃপ্তি লাভ করতো, গর্বভরে দাপিয়ে বেড়াত পৃথিবী, যাদের অস্ত্রের মুখে থরথর করে কাপতো পৃথিবী। আজ তারা কেউ নেই, কেউ না, নিঃশেষ হয়ে গেছে তাদের সমস্ত প্রতাপ, সব জৌলস, সব অহংকার। ধুলায় লুটিয়ে গেছে সব। পৃথিবী এখন মৃত্যুপুরি। যাদের চোখের ইশারায় অস্ত্র হাতে জীবন দিত লাখো সৈনিক, ঐতো কংকাল সেই সব জেনারেল, এডমিরাল আর মার্শালগনের, যারা কিছুদিন আগেও অহংকারী দৃষ্টি মেলে দিত পৃথিবীজুড়ে, দাপিয়ে বেড়াত আকাশ-বাতাস-সমুদ্র। পৃথিবীর বিষাক্ত আবহাওয়া তাদের কাউকে ক্ষমা করে নি। মৃত্যুর কাছে আজ সবাই তারা পরাজিত।

[৫]
-মাননীয় পরিষদ। আজ এটাই সম্ভবত শেষ আলোচনা। শব্দগুলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে বললেন মিরান; পৃথিবীতে আমরা এখনও শ’পাচেক লোক জীবিত আছি। আমি যে নির্দেশ দিয়েছিলাম সেই মত কাজ করা হয়েছে। সংরক্ষিত সমস্ত খাদ্য প্যাকেটজাত করা হয়েছে, যা দ্বারা আপনারা বিশ বছরের অধিক সময় পার করতে পারবেন। বেশ কিছু ওষুধও আছে আমাদের সাথে। শ’পাচেক নারী পুরুষের মধ্যে ডাক্তার, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, প্রায় সব পেশার লোকই আছে, যারা পৃথিবীর সর্বোচ্চ মেধাবীদের অন্তর্ভুক্ত। আরো আছে শিশু-কিশোর এমন কি সদ্যজাত শিশুও। পৃথিবীর অত্যাধুনিক মহাকাশযানটি প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে প্রায় এক হাজার লোকের সংকুলান হবে। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন এ অল্প ক’দিনেই পৃথিবীর জনসংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে তাই দ্রুত কেটে পড়তে হবে। পৃথিবীর আবহাওয়া এখন খুবই বিষাক্ত।
- আমরা কোথায় যাব মহামান্য মিরান? বলল এক তরুনী।
- আমি জানি না। তবে বিজ্ঞানীরা আমাকে জানিয়েছেন মঙ্গলের কোন এক পৃষ্ঠে নাকি সামান্য কিছু পানি আর অতি অল্প পরিমান অক্সিজেনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। আপনারা সেখানে গিয়ে বেচে থাকার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। সেটাও যদি ব্যর্থ হন তবে অজানার পথে মহাশূন্যে ভেসে চলবেন। কিন্তু পৃথিবী হতে পালিয়ে গিয়েই যে সবাই বেচে যাবেন এমন নিশ্চিত বলা যায় না কারণ সবাই দেহে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন রোগের জীবানু। আর অবশ্যই আপনারা সাথে নিয়ে যাবেন বিভিন্ন খাদ্য শস্যের বীজ। আপনারা জানেন আজ পৃথিবীতে একটি ঘাসও অবশিষ্ট নেই, শুধু মরুভূমি আর পাথুরে জমি।

[৬]
নারী পুরুষ সবাই একে একে মহাকাশযানে উঠল। শুধু মিরান আর গুটি কয়েক লোক এখনও বাহিরে ব্যস্ত-কথায় মগ্ন।
- মহামান্য মিরান আপনী এ-কি বলছেন? আপনার বুদ্ধিতে আমরা নতুন জীবনের আশা খুজে পেয়েছি আর আমরা আপনাকে ফেলে চলে যাবো?
- না ডাক্তার। আমি এমনিতেই বৃদ্ধ। আমি পৃথিবী হতে পালিয়ে যেতে চাই না। আমি এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করব। তোমরা আমাকে অনুরোধ করো না।
- তা হয় না মহামান্য মিরান । আপনার জন্য না হলেও আমাদের জন্য হলেও চলুন। আপনাকে আমাদের খুব দরকার। বলল অন্য এক বৃদ্ধ বিজ্ঞানী।
- না বন্ধু। তোমরা জান আমার কথার নড়চড় হয় না, আমি অনেক ভেবে চিন্তে কথা বলি এবং সিদ্ধান্ত নিই। বরং তোমরা আমাকে কিছুদিনের খাদ্য, ওষুধ আর একটি অক্সিজেনের সিলিন্ডার দিয়ে যাও যদি আরো কিছুদিন বেশী বেচে থাকতে পারি এই পৃথিবীর বুকে।
অনেক্ষন যাবৎ বাকবিতন্ডা চলল, কিছুতেই বৃদ্ধ মহাকাশযানে চড়তে রাজী হলেন না।
- কিন্তু আপনার অবদান এই সভ্যতা আমৃত্যু মনে রাখবে। এই সভ্যতা হবে মিরান সভ্যতা। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল বিজ্ঞানীরা।
ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এল জর্জ রর্বাট -মহামান্য মিরান, আপনীতো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন। আমি আপনাকে অনুরোধ করব না। আমার স্ত্রী মারিয়া, সে আপনাকে খুবই শ্রদ্ধা করে, খুবই ভালবাসে। মারিয়া আপনার সাথেই পৃথিবীতে মারা যেতে আগ্রহী।
- অবাক হলেন বৃদ্ধ। তারপর ক্ষোভে চোখ রক্তবর্ন করে ফেললেন। বরার্ট তুমি ওকে ভালবাস না? কি বাজে বকছো তুমি?
- মাফ করবেন স্যার। আমি অবশ্যই তাকে খুব ভালবাসি আর তাই তো ওর ভালবাসার প্রতিদান দিতে চাই।
- কি বলছ রবার্ট? তোমার মাথা ঠিক নেই।
- স্যার, আমার মারিয়া অসুস্থ। পৃথিবীর বিষাক্ত আবহাওয়া ওর রন্দ্রে রন্দ্রে ঢুকে পড়েছে। দু’চারদিনের মধ্যেই হয়তো সে মারা যাবে। মৃত্যুর কিছু লক্ষনও ফুটে উঠেছে ওর শরীরে। কিন্তু এখনও সে শাররীক ভাবে সক্ষম। স্বাভাবিক হাটাচলা করতে পারে। ক’টা দিনতো আপনাকে সাহায্য করতে পারবে।
- না রবার্ট তুমি ওকে নিয়ে যাও। মৃত্যুর সময় তোমার কাছে থাকা খুবই জরুরী।

সবাই মহাকাশযানে উঠে পড়ল। মারিয়া কান্না জড়িত কন্ঠে রবার্টকে বিদায় জানাল। বৃদ্ধ মিরান বাবার স্নেহে মারিয়াকে জড়িয়ে রাখলেন। বন্ধ হয়ে গেল মহাকাশযানের সব প্রবেশ পথ। একদল মৃত্যুপথ যাত্রী নতুন জীবনের আশায় মহাকাশে ছুটে চলছে। পৃথিবীর মাটিতে শুধু দাড়িয়ে রইল মারিয়া আর মিরান দু’জন প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে সরে আসল।

[৭]
এতদিনে ‘সে’ প্রশান্তি অনুভব করল। সে অনন্ত আকাশে তাকিয়ে খুজতে লাগল- মেঘ ভাই, এস, এদিকে এস, দেখে যাও আমি পেরেছি। আমি সফল হতে যাচ্ছি। তোমাকে আর আমা হতে দূরে থাকতে হবে না। সূর্য্যি মামা আজকে আমি বিষন্ন নই, আজ আমার সাথে কথা বল। দেখ আমি মানুষের উপর প্রতিশোধ নিতে পেরেছি। এবার সে তার ছোট্র একটি হাসি ছড়িয়ে দিল পৃথিবীতে।

[৮]
বৃদ্ধ মিরান দেখলেন যেখানে সে দাড়িয়ে আছে, পায়ের কাছেই একটি ঘাস ফুলের চারা, মারিয়ার মুখের কালো তিলকের আকৃতির একটি ফুলও ফুটেছে। দুই-তিন সেন্টিমিটার উচ্চতার একটি চারা গাছ। আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলেন বৃদ্ধ- দেখ, মারিয়া দেখ, এই দেখ ঘাসফুল উদ্ভিদ। পৃথিবীতে আবার প্রাণ ফিরে এসেছে। দেখ ফুলটা কি সুন্দর হাসছে। প্রাণ এসেছে পৃথিবীতে, প্রাণ। তুমি এখানে দাড়াও মারিয়া।

মিরান দৌড়ে গেল মহাকাশযান লক্ষ্য করে। চিৎকার করতে থাকল- রবার্ট, রবার্ট এই দেখ প্রাণ এসেছে পৃথিবীতে । কিন্তু ততক্ষনে মহাকাশযানটি ছুটে চলেছে মঙ্গলের উদ্দেশ্যে। বিষন্ন চিত্তে মারিয়ার কাছে ফিরে এল মিরান । একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ঘাসফুলের দিকে। দৃষ্টি ফেরাল মারিয়ার চোখে;- মারিয়া প্রাণ এসেছে পৃথিবীতে। আবার প্রানের স্পন্দনে মুখরিত হবে পৃথিবী। মানব শিশুদের কোলাহলে আবার মুখরিত হবে এই বিরান ভূমি। আমার সর্বোচ্চ বিদ্যা আমি ঢেলে দেব তোমার প্রতি। তোমাকে কিছুতেই মরতে দেব না। আবার সুস্থ হবে তুমি। তুমি হবে এই পৃথিবীর প্রথম মানবী ইভ।

[৯]
সন্ধ্যে না হতেই আবার ঘাসফুলটি শুকিয়ে গেল। দেখতে দেখতে বেশ কয়েক মাস চলে গেল। মারিয়া মাঝে কিছুটা সুস্থ হয়েছিল, এখন আবার অবনতি ঘটছে। ইতিমধ্যে বৃদ্ধ মিরান মারা গেছেন। মারিয়া বুঝতে পারছে তারও বেশীদিন বাকী নেই।
ব্যাস্ত পদক্ষেপে মারিয়া শহরে প্রবেশ করল। খা-খা করছে সমস্থ দালান-কোঠা, রাস্তা-ঘাট। থমথমে পরিবেশে ভূতুড়ে আতংক বিরাজ করছে। কোথাও প্রানের চিহ্ন মাত্র নেই। অট্রালিকার গায়ে খোদাই করে কিছু আকিবুকি করল মারিয়া, নেমে এল বিশাল অট্রালিকার সামনে। গাড়িটির দিকে তাকিয়ে হাসল- পৃথিবীর সবচেয়ে দামী গাড়ি। হাঃ হাঃ। পৃথিবীর সর্বোচ্চ ধনী ব্যক্তির জন্য তৈরী করা হয়েছিল এটি। গাড়িতে চড়ল মারিয়া। জিপিএস ফেড অটোমেটিক কন্ট্রোলার, সম্পূর্ণ কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত গাড়িটি। কম্পিউটার গাড়ির সমস্ত যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করল; গ্যাস, ক্যামেরা, ছোট রাডারটি, সব পরীক্ষা করল। সম্পুর্ণ অপারেশনাল। গাড়ির ভিতর ছোট একটি কনফারেন্স টেবিল, চারপাশে স্বর্ণ আর হীরা খচিত কারুকার্য। বসার আসনগুলিও চমৎকার। গাড়ি স্টার্ট নিল। চলতে শুরু করল শহরের রাস্তা ধরে, শহর ছেড়ে গ্রামে আবার শহরে, চলছে তো চলছেই।
এবার মুচকি হাসল মারিয়া। একা একাই বলল- মহামান্য মারিয়া, পৃথিবীর একছত্র অধিপতি, আপনী আসন গ্রহণ করুন।
মারিয়া আসন গ্রহণ করল এবং চির নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। গাড়িটি এগিয়ে চলছে তাকে দেয়া গন্তব্যের পথ ধরে।

[১০]
আবার সবুজে- সবুজে মুখরিত হল পৃথিবী। আকাশ ছোয়া বৃক্ষ এখন খেলা করে মেঘের সাথে। পাখির কিচির মিচির শব্দ ভেসে যায় সুদুরে। অরন্যে- অরন্যে ছেয়ে গেল মাঠ-ঘাট। পৃথিবীর আবহাওয়া এখন সম্পুর্ণ সতেজ। সমুদ্রের পানি স্বাভাবিক। ঠান্ডা হাওয়া এখন দোল দিয়ে যায় কাশবনে।
এখন সে আনন্দিত। সূর্য আর মেঘ এখন তার সাথে অভিমান করে না। সে সারারাত প্রেম করে চাদের সাথে। চাদকে সে আমন্ত্রণ জানায় পৃথিবীর মাটিতে আর তারকারাজি মিটমিটিয়ে হাসে বন্ধুর পাগলামি দেখে। পৃথিবীতে এখন কোন মানুষ নেই তাই সবাই তার আপনজন।

[১১]
ধীরে-ধীরে মহাকাশযানটি নেমে আসে সবুজ ঘাসের উপর। আনন্দে আত্মহারা হয়ে বেরিয়ে আসে সাত জনের একটি অভিযাত্রীদল। দুজন নারী, দুজন পুরুষ আর তিন জন শিশু-কিশোর। সবার উস্ক-খুস্ক চুল, পরনে ছেড়া মলিন পোশাক। পুরুষ দুজনের হাতে দুটি ক্ষুদ্র অস্ত্র। শিশু- কিশোররা চিৎকার চেচামেচি শুরু করে দিল। নারী দুজন ঝোলার মধ্য হতে মানচিত্র বের করে ধরল, মানচিত্র দেখে-দেখে হাটছে সবাই। কবুতরের ঝাক যখন ওদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল, গুলির আঘাতে ছিটকে পড়ল ঘাসের উপর আর করুন আর্তনাদ ভেসে চলল বাতাসে ভর করে।

চমকে উঠল “সে”- আর্তনাদ, করুন কান্না। এ কার কান্না? শীতল ভয়ের এক অনুভুতি বয়ে গেল ওর শরীরের মধ্য দিয়ে। তবে কি—? নাহ, কিছু ভাবতে পারছে না সে। তাহলে কি মানুষ আবার ফিরে এল? পাখির কান্না, পশুর আর্তনাদ। বাতাসে বারুদের গন্ধ। এগুলো তো মানুষের উপস্থিতিরই লক্ষন। হ্যা সবই তো মিলে যাচ্ছে। এরাই তো একদিন আমাকে নিচিহ্ন করতে চেয়েছিল। নাহ, কিছুতেই এটা বরদাশত করা হবে না।

[১২]
- দাড়াও তো রবার্ট। বলল বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বৃদ্ধটি। অভিযাত্রীর দলটি থমকে দাড়ায়।
- এই দেখ, এটি আমাদের সেই অট্রালিকাটি নয়, যেখানে আমরা শেষ সম্মেলন করেছিলাম? ওই তো আমাদের ন্যাশনাল পার্লামেন্ট, মনে আছে রবার্ট মহামান্য মিরানের সাথে আমরা কতবার এখানে এসেছিলাম!
-হ্যা, তাই তো। আর পায়ের তলায় ঘাসের নীচে তাহলে রাস্তা। আগ্রহ ভরে বলল রবার্ট।
- হ্যা, সেটাই তো মনে হচ্ছে।
- সোনামনিরা, এই দেখ এটা তোমাদের আসল মাতৃভুমি। বলল এক নারী। দেখ, দেখ, যে সব গল্প তোমাদের শুনাতাম সেইসব অট্রালিকা, গাড়ি আরো কতোকিছু। সব আমাদের জন্যই প্রস্তুত, এখন আমরা সুখে শান্তিতে বসবাস করব।। বাচ্চারা গাড়ি গুলো দেখে লাফালাফি শুরু করে দিল।
- জর্জ রবার্টসন, বন্ধু আমার। দেখ তো এই দেয়ালে কি লেখা?
রবার্টসন এগিয়ে আসে- আরে, আরে, এতো আমার প্রিয়তমা মারিয়ার হাতের লেখা।
খোদাই করে লেখাগুলো পড়তে লাগল রবার্ট- “হে পথিক একটু দাড়াও! হে মানব, তোমরা যদি ভূল করে এই গ্রহে এসে থাক তবে এখুনি ফিরে যাও। এটা পৃথিবী, চির কল্যাণময় যার অর্থ। কোন যুদ্ধাংদেহী মানব কিংবা ক্ষমতালোভীদের জন্য নয়। কোন মানুষ এখানে বাচতে পারবে না। তোমরা কি দেখছ না সুউচ্চ অট্রালিকা, সুবিশাল আকাশ, সমুদ্রের ঢেউ আর প্রশস্ত রাস্তা, এসবই একদা তাদের রাজত্বে ছিল যারা সগর্বে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াত। আজ কোথায় তারা যাদের সম্মুখে, পশ্চাদে সারি-সারি নত মাথা এগিয়ে যেত, বিন্দু মাত্র বিপদ যাদের স্পর্শ করতে পারত না? কিন্তু মৃত্যুর কাছে আজ সবাই পরাজিত। শকুনে খেয়েছে তাদের লাশ। পড়ে আছে শুধু শূন্য কংকাল। প্রতিশোধের আগুনে কেউ টিকতে পারে নি। এখানে চলছে খেলা, প্রতিশোধের খেলা, প্রকৃতির চরম প্রতিশোধের খেলা। সে তোমাকেও ক্ষমা করবে না। এখনও সময় আছে, মনকে ভাববার অবকাশ দিও না। দোহাই লাগে হে মানব, মহাবিশ্বে অন্তত একটি গ্রহে মানব সভ্যতা টিকিয়ে রাখ। চলে যাও এখুনি। আর যদি দেখা পাও রবার্টসন, তবে তাকে জানিও প্রিয়তমা মারিয়ার অভিনন্দন।”

সবার চোখের জল টপটপ করে পড়ছে। কান্নাজড়িত কন্ঠে রবার্ট বলল- কোথায় যাব মারিযা? মহাবিশ্বে কোথাও যে মানুষের বসবাসের যোগ্য ভূমি নেই। মঙ্গলের অনুপযোগী বায়ু আর পাথুরে মাটির সঙ্গে লড়াই করতে করতে অবশিষ্ট আছি আমরা এই ক’জন। নাহ, আমরা এই পৃথিবী ছেড়ে আর যাব না। কোথাও যাব না!
ক্লান্ত পদক্ষেপে আবার হাটতে শুরু করল সবাই।
- রবিনসন দেখ, থোকা-থোকা আংগুর। দেখ, কত ফলজ বৃক্ষ। এখন সবই আমাদের। আমরা এখানে আবার বংশবিস্তার করব। প্রশস্ত রাস্তা ধরে আবার ছুটে চলবে আমাদের গাড়ি, আকাশে উড়বে বিমান, সমুদ্রে বিশালাকার জাহাজ। চিন্তা কি, সব তো তৈরী করাই আছে। আমাদের বংশধররা শুধূ আহরোন করবে। ঐ দেখ বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্রন্থাগার, সমস্ত জ্ঞান সংরক্ষিত আছে সেখানে। পুরো গ্রহ জুড়ে আছে কম্পিউটারের বিশাল নেটওয়ার্ক, জ্ঞানের অসীম ভান্ডার ইন্টারনেট। সব, সব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের জন্য প্রস্তুত। একটা শান্তিময় ভূমি আমরা গড়ে তুলব।
দু’জনে মুঠো ভরে থোকা থোকা আংগুর পেড়ে আনল। একফালি কাপড় বিছিয়ে রাস্তায় বসল। বোতলে ভরে আনল টাটকা পানি।
-পানি, আহ্ কি চমৎকার। তৃপ্তির সাথে পান করল ওরা।

মুঠোভরে আংগুর মুখে পুরল সবাই। এমন সুস্বাধু খাবার বুঝি কেউ কখনো খায় নি।
মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল- কি ব্যাপার মাথা ব্যাথা করছে কেন? শরীরটা এমন করছে কেন?
দাড়ানোর চেষ্টা করল সবাই কিন্তু পারল না। বিষাক্ত ফলের বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল ওরা। চোখ দুটো যেন বন্ধ হয়ে আসছে। চোখ বন্ধ করার আগে সবাই দেখতে পেল আকাশে কিছু শকুন সর্বোচ্চ উচ্চতায় উড়ে বেড়াচ্ছে, যেন এদিকেই ছুটে আসছে।

শুধু নয় বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে একটি গাছ জড়িয়ে ধরেছে, সে যেন কিছু বলতে চায়।
- ইমা। কেউ যেন ডাকল। চমকে উঠল মেয়েটি।
- ইমা। কি চাও তুমি? যেন মস্তিস্কের নিউরনের ভাজে ভাজে আবার শুনতে পেল মেয়েটি।
- আমাকে বাচাও। আমি বাচতে চাই। কান্না জড়িত কন্ঠে বলল ইমা।
নিঃশব্দে হাসল কেউ – কেন তুমি বাচতে চাও? গর্বভরে পৃথিবী প্রকম্পিত করতে চাও বলে?
- না, না আমি বাচতে চাই তোমার মহিমা আর সৌন্দর্য দেখব তাই।
- আমি দুঃখিত ইমা। তুমি মানুষ, এখানে মানুষ বাচতে পারবে না। তোমাদের জন্য এটা একটা নিষিদ্ধ গ্রহ।
- আমি তো কোন অপরাধ করি নি।
- হ্যা ইমা, আমি জানি তুমি পুতঃপবিত্র। পৃথিবীর সমস্ত সুন্দর তোমার মাঝে। তবুও আমি খুব দুঃখিত ইমা। হ্যা, তুমি বেচে থাকবে আমার অন্তরে, ফুল হয়ে ফুটবে আমারই শাখে। তুমি এখন যাও । আমি সত্যি খুব দুঃখিত ইমা।
- না, না আমাকে বাচতে দাও। কান্নায় থরথর করে কাপছে ইমার শরীর। কিন্তু সব নিরব, কোন উত্তর এল না। ইমার নিথর দেহটি পড়ে গেল মাটিতে।

[১৩]
অট্রালিকা গুলো এখন পশু-পাখি, জীব-জানোয়ারের আবাসস্থল। লতা-পাতা আর গাছে ঢাকা পড়েছে বহুতল ভবনগুলো।

সে এখন চরম আনন্দে উদ্বেলিত। এখন বুঝি তার মহাবিশ্বে আর কোন শত্রু অবশিষ্ট রইল না। মৌমাছিরা মধু আহরনে ব্যস্ত। পাখিরা গাছের শাখে বসে কিচির মিচির ডাকছে। বাতাস এসে আলতো করে চুমো খায় তার শরীরে। সমস্ত দুঃখ বেদনা আর আত্ম-অহংকার ভূলে সে এখন বিজয়ীর বেশে দাড়িয়ে আছে। এটাই বুঝি তার প্রশান্তি কারণ সে প্রতিশোধ নিতে পেরেছে।

[১৪]
উপসংহারঃ
কিন্তু তবুও প্রকৃতি ও পরিবেশ মানুষকে ভালবাসল, মানুষের কাছ থেকে আলাদা থাকতে চাইল না। প্রকৃতি যদি মানুষকেই ভাল না বাসে তবে কি করে সে তার সৌন্দর্য ঘোষনা করবে? তাই ছোট শিশু ইমার মৃতদেহের উপর একদিন গজিয়ে উঠল একটি রক্ত গোলাপের চারা এবং তার নিচে এসে বাসা বাধল শান্তির দুত সাদা পায়রা, আর সেটা ছিল ছোট্র শিশু ইমার প্রান। ইমার জীবনের বিনিময়ে জম্ন নিল ভালবাসার প্রতিশ্রুতি রক্ত গোলাপ। এই ভালবাসার আহবান ছিল পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য, এই ভালবাসা ছিল নিঃপাপ শিশু ইমার জন্য। কারন প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ যদি শিশুর মত না হয় তবে তার জন্য টিকে থাকা সত্যিই কষ্টকর। (সমাপ্ত)

এম. হাতাশি-
অক্টোবর ১৮, ২০০৭ ইং
বিএনএস ঈসা খাঁ, নিউ মুরিং, চট্রগ্রাম।

Comments

আনিচুর রহমান said…
বিস্ময়কর এক গল্প। পরিবেশ রক্ষায় আমাদের আরো সচেতন হতে হবে।
গল্পটির জন্য ধন্যবাদ।
Mohammad Arif Uz Zaman said…
I am absolutely amazed by the story.
My heartfelt salute to Hatashi for such a touchy writings.

Hope we all will be more aware of Mother nature and her well beings and can make this Universe suitable for living for eternity.
কনফিউজ said…
ভাল লাগল। ধন্যবাদ।
এই পৃথিবীর মানুষের শতভাগ লাইফ সাপোর্টে আছে। তারা যে কোন পরিবেশে সারভাইভ করবে পারে।
সুমন said…
সুন্দর গল্প। ভাল লাগল, ধন্যবাদ।

অনেক দিন পর হঠাৎ হঠাৎ লেখেন কেন? নিয়মিত লিখতে পারে না?