বিজ্ঞান কল্পকাহিনীঃ রিও দে লা প্লাতা!

সে স্মৃতি হাতড়ে চলে গেল তার অতি প্রিয় শৈশবে, নিউরনের স্তরে-স্তরে তন্নতন্ন করে খুজতে থাকল। সেখানে সে তার স্মৃতিতে থাকা প্রথম দিনটিকে খুজে পেল; তখনো হাটতে শিখে নি। ভাইবোনদের কোলে চড়ে দুষ্টুমি করে বেড়াত- এমনি দু’চারটে দিনের কথা তার মনে পড়ে। তারপরের স্মৃতিটা ছিল যখন সে সবেমাত্র হাটতে শিখেছে, কারো সাহায্য ছাড়াই একা হাটতে পারার প্রথম দিনটি। বুয়েন্স আয়ার্সের রাস্তায় সে একাই হেটে বেড়াত আর সমস্ত পথচারীরাই অন্তত তার দিকে একবার ফিরে তাকাত। কেউবা আবার চুপটি করে মুখে একটু হাত বুলিয়ে যেত। তার একজন বান্ধবীও ছিল যাকে নিয়ে সে সারাদিন শহরের অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াত। শৈশবের সেইসব ভালবাসাময় দিনগুলি সে ভুলতে পারে না, তার মনটা বিষন্ন হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনেই সে বুঝতে পেরেছিল মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তার অজান্তেই তাকে রিক্রুট করা হয়েছিল আর সে বাধা পড়ে গিয়েছিল অদৃশ্য এক শক্তির বাহুবন্ধনে। বিগত দিনগুলি যে এত পরিকল্পনা মাফিক ছিল সে কখনোই বুঝতে পারে নি। তার দৈনন্দিন কিছু কাজকর্ম ছাড়া বড়বড় সিদ্ধান্তগুলি সে নিজের ইচ্ছায় করতে পারত না, এখনও পারে না; অবশ্য সে ক্ষতিকর কিছু খুজে পায় নি। কিন্তু নিজের সত্তাকে ধরে রাখতে চেয়েছে সবসময়, সে সব সময় অনুভব করতো কেউ বুঝি তাকে আড়াল থেকে কোথাও ঠেলে দিচ্ছে, অনেকবার পালাতে চেয়েছে কিন্তু সে পারে নি। নিজের ইচ্ছায় কিছুই করতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে সে নিজের মধ্যে অদ্ভুদ কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ করেছিল, হঠাৎ হঠাৎ সেই অনুভুতিগুলি দেখা দিত। দু’চারবার নিজের ইচ্ছায়ই সেই অনুভুতির প্রকাশ ঘটাতে পেরেছিল। এসব কখনোই বিশ্বাস করে না কিন্তু কি করবে যখন সে জানতে পারল শ্রাব্যতার সীমা সর্ম্পকে মানুষ শুধু বিশ হার্জ থেকে বিশ হাজার হার্জের শব্দ তরঙ্গই শুনতে পারে। কিন্তু তাহলে মানুষের চিন্তার তরঙ্গ আর মস্তিস্কের উদ্দিপনা কি বিশ হার্জের নীচে বা বিশহাজার হার্জের উপরে? না হলে সে কিভাবে মানুষের চিন্তায় প্রবেশ করতে পারে? বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পড়ার মত স্মৃতি আর চিন্তাকে ঘেটেঘেটে দেখতে পারে- মানুষের মস্তিস্কের চিন্তা আর স্মৃতির উপরের আস্তরন ঠিক নিউক্লিয়াস মেমব্রেনের মত; স্ফটিকাকার আর স্বচ্ছ! সে ভাবে পুরো পৃথিবীটাই যদি শুধু একটা মস্তিস্ক হত। কম্পিউটার হার্ডডিস্কের মত পৃথিবীর মাটি, ইট, কাঠ, পাথর, পাহাড় সব কিছুই যদি স্মৃতি সংরক্ষন করতে পারত! সে তাহলে কি ওইসব স্থান থেকেও স্মৃতিকে বের করে নিয়ে আসতে পারত? সে যখন ক্রমাগত নিজের স্মৃতিতে প্রবেশ করতে লাগল তখন সে নতুন কিছু আবিস্কার করল; সে এবার পরিস্কার বুঝতে পারল চৌদ্দ বছর বয়সে তাকে রিক্রুট করা হয়েছিল’ তার এই ত্বত্ত বা ধারনাটা ভুল, প্রকৃতপক্ষে তাকে রিক্রুট করা হয়েছিল আরো পুর্বে যখন তার বয়স মাত্র সাত বছর। চৌদ্দ বছর বয়সে সে জ্ঞানের প্রথম স্তর দশর্ন করতে পেরেছিল, সে প্রায় তারই সমবয়সী একজন উপযুক্ত শিক্ষিকা পেয়েছিল যে তাকে শিখিয়েছিল কিভাবে চিন্তা করতে হয়, জ্ঞানীরা কিভাবে চিন্তা করে, জ্ঞানের সমস্ত দৃষ্টিকোন থেকে কিছু পাঠ সে পেয়েছিল। সে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্দাপন করে তখন তার জন্য আরো একজন শিক্ষক নিয়োগ করা হয় যে তাকে পৃথিবীর সমস্ত মহাজ্ঞানীদের জ্ঞানে পরিপুর্ন করে তুলতে লাগল। একটি সিদ্ধান্ত হবে- শতশত মানুষের আলোচনা, ফাইল ছোড়াছুড়ি, অতপর যখন সিদ্ধান্ত তৈরী হল কিন্তু ততক্ষনে তার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেল। সে জানে মানব সভ্যতার অনেক গুরুত্বপুর্ন সিদ্ধান্তে সে রায় দিয়েছে- তার অজান্তে। তার দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষন করা হত, তার কাছে জানতে চাওয়া হত; তুমি যদি এই ক্ষমতাধর মানুষটি হতে আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও অধিকার একাই তোমার হত, তাহলে কি সিদ্ধান্ত নিতে তুমি? এবং সেটাই ছিল গৃহীত সিদ্ধান্ত। কি সহজ সমাধান, যা দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর একটি আলোচনা আর ফাইল ছোড়াছুড়ি থেকে বেরিয়ে আসত। সে বুঝতে পারে না; একেই কি জ্ঞান বলে যা সে অজর্ন করছে? তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শিক্ষকই আবার তাকে শিখিয়েছিল; সমস্ত শিক্ষাই অর্থহীন। তাহলে এসবের পুর্নতা কোথায়? বুয়েনোস আইরেস- স্পেনীয় ভাষায় বুয়েনোস্‌ আইরেস্‌ অর্থাৎ "ভাল বাতাস"। দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্র আর্জেন্টিনার রাজধানী, বৃহত্তম শহর ও বন্দর। এটি রিও দে লা প্লাতা নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। ১৮৮০ সালে শহরটিকে বুয়েনোস আইরেস নামের প্রদেশ থেকে বিছিন্ন করা হয় এবং বেলগ্রানো ও ফ্লোরেস শহরকে সাথে নিয়ে স্ব্বায়ত্বশাসিত বৃহত্তর বুয়েনোস আইরেস মহানগর এলাকা গঠন করা হয়, যার প্রশাসনিক নাম "সিউদাদ আউতোনোমা দে বুয়েনোস আইরেস"।  মূল বুয়েনোস আইরেস শহরের জনসংখ্যা প্রায় ২৭ লক্ষ, আর বৃহত্তর বুয়ানোস আইরেস মহানগর এলাকার জনসংখ্যা ১ কোটিরও বেশি। ১৯৬০-এর দশক থেকে শহরটির জনসংখ্যা মোটামুটি স্থির হয়ে আছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১৩,০০০ জন। শহরের অধিবাসীরা মূলত স্পেনীয় ও ইতালীয় বংশোদ্ভূত। সে তার এই শহরকে ভালবাসে মনে প্রানে, ভালবাসে এই দেশকে কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করতে ভয় পায়, লজ্জা পায়, হীনমন্যতায় ভুগে। রিও ডি লা প্লাটা রিভার –হীরার নদী, রুপার নদী, এই নদীর তীরের শহর বুয়েনোস আইরেস, এখানেই তার জম্ন, সে এখানেই তার জীবনের পুর্নতা চায়। সমুদ্রের মতই মহাকালের অনন্ত পথে টিকে থাকতে চায়, রিও ডি লা প্লাটার তীরে! 


Comments