অতপর শয়তান তার সর্বশক্তি দিয়ে আইয়ুবকে আঘাত করল এবং তার সমস্ত সম্মান ও সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে নিজ জাতির মাঝে তাকে বেইজ্জতি করল

কোন এক সময় হযরত আইয়ুব (আঃ) নামে একজন পরাক্রমশীল নবী বাস করতেন। আল্লাহ তাকে প্রচুর ধন-সম্পত্তি ও সম্মান দান করলেন যেন সে তার জাতির কাছে শান্তির বানী প্রচার করতে পারে। হযরত আইয়ুব (আঃ) বেশভাল ভাবেই তার প্রস্তাবিত শান্তির কথা তার জাতির কাছে প্রচার করে যেতে লাগলেন। 

কিন্তু ওই শয়তান বারবার তার কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে লাগল। কিন্তু সে যখন কোন ভাবেই আইয়ুব (আঃ) কে ঘায়েল করতে পারছিল না তখন সে একদিন আল্লাহর কাছে গিয়ে হাজির হলো। 
আল্লাহ শয়তানকে দেখে বললেন; কি হে, কোথা থেকে ঘুরে এলে?
শয়তান বলল; আপনার সৃষ্ট মহাবিশ্বে পৃথিবী নামক একটি গ্রহ থেকে ঘুরে আসলাম।
আল্লাহ আবার তাকে প্রশ্ন করলেন; কি দেখলে তুমি?
শয়তান বলল; হে আল্লাহ, আমরা তো আগেই আপনাকে নিষেধ করেছিলাম মানুষ সৃষ্টি করতে, তারা এখন নিজেদের মধ্যে হানাহানি করছে আর আপনার সম্মানিত নামকে অস্বীকার করছে, আপনার বিরুদ্ধে গুনাহ করছে। 
তখন আল্লাহ বললেন; কিন্তু তুমি কি আমার প্রিয় বান্দা আইয়ুবকে দেখেছ? সে কত সৎ এবং ন্যায়বান, সে কখনোই আমার বিরুদ্ধে গুনাহ করেনি। সে তো নিজের সুখের কথা চিন্তা না করেই তার মন-প্রান-জীবন দিয়ে শান্তির বানী প্রচার করে যাচ্ছে। তার মত নিখুত মানুষ কি তুমি আরও একটি খুজে পেয়েছ?
শয়তান বলল; ওহ মাই লর্ড। আপনী ভাল করেই জানেন কেন সে আপনাকে সম্মান করে, আর কেনই বা সে আপনাকে ভয় পায়। কারন আপনী তাকে অনেক ধন-সম্পত্তি দিয়েছেন। তার এখন আর কিছুই চাওয়ার বাকী নেই তাই সে আপনাকে ভয় পায়, সম্মান করে। আপনী হাত বাড়িয়ে সব কিছু কেড়ে নিন দেখবেন সে সাথে সাথে আপনাকে অস্বীকার করবে। এবং আপনার বিরুদ্ধে গুনাহ করবে। কারন সে তো এখন শুধু আপনার সাথে তার সু-সর্ম্পকটাকে ব্যবহার করছে আর আপনী তাকে যতটা না ভালবাসেন সে তার চেয়ে বেশী করে তার জনগনের মাঝে প্রচার করে। কিন্তু আমার আর আপনার সর্ম্পক কি শুধু মাত্র এক আদমের উপরে নির্ভর করে মাই লর্ড?
তখন আল্লাহ বললেন; আযাযিল, নিশ্চয়ই আমি যা জানি তুমি তা জান না, আমি যাকে তৈরী করেছি, যাকে বন্ধু মনে করি তাকে অসম্মান করা মানে আমাকে অসম্মান করা, আমাকে প্রত্যাখ্যান করা। সে আমার প্রিয় বান্দা, আমি বহু পুর্বেই তাকে একাধিকবার পরীক্ষা করে তবেই শান্তির বানী প্রচারের জন্য ওই জাতির উপরে মনোনিত করেছি। এবং অতপর আমি তাকে আমার সর্বোত্তম উপহার নব্যুয়াত দান করেছি। 
কিন্তু শয়তান তবুও আল্লাহর সাথে তর্কে লিপ্ত হলো, তখন আল্লাহ বললেন; ঠিক আছে, আমি তার সমস্ত সম্মান আর ধন-সম্পত্তি তোমার হাতে ছেড়ে দিলাম। হাত বাড়িয়ে তুমি সব কিছু কেড়ে নাও কিন্তু তার জীবনটা নিও না। তারপর তুমি দেখ সে কি প্রকৃতই শান্তিকামী আর আমার মনোনিত নবী কিনা। 

তখন শয়তান আবার পৃথিবীতে ফিরে আসল এবং আইয়ুব (আঃ) এর সম্মান আর ধন-সম্পত্তি সবকিছু কেড়ে নিল। তাকে তার জাতির লোকদের মাঝে বেইজ্জতি করল, অপমানিত করল, তার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করল এবং তার সমস্ত অধিকার আর সম্মান হতে তাকে বিতাড়িত করল। 
কিন্তু নিজ জাতির মাঝে নিগৃহীত হয়ে আইয়ুব (আঃ) আল্লাহকে ভুলে গেলেন না বরঞ্চ আগের চেয়েও আরো বেশী বেশী করে আল্লাহর ইবাদাত করতে লাগলেন আর বললেন; তুমি আমার সম্মান, সম্পদ আর জীবন-যৌবন সবকিছু কেড়ে নাও কিন্তু আমাকে তোমার কাছে অপরাধী করো না। 
আইয়ুব (আঃ) এর দুর্দশা দেখে তার কাছের আর বহুদিনের বিশ্বস্ত কর্মচারী ও বন্ধুরা তাকে ছেড়ে চলে গেল, তার স্ত্রী তাকে বলল; কেন তুমি এখনো বোকার মত আল্লাকে স্মরন করছো? তিনি তো তোমাকে ত্যাগ করেছেন। 
একটা সময়ে আইয়ুব (আঃ) পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়লেন কিন্তু তবুও তিনি বোকার মত আল্লাহকে দোষারোপ করলেন না। 


অন্য একদিন শয়তান যখন আবার আল্লাহর কাছে আসল, তিনি বললেন; তুমি কি পৃথিবীতে আমার বান্দা আইয়ুবের মত দ্বিতীয়টি আর দেখেছ? সে সৎ, বিনয়ী এবং আমার প্রতি অনুগত, তুমি তার সমস্ত সম্মান আর অর্থ কেড়ে নিয়েছ কিন্তু তবুও সে আমার নামকে অসম্মান করে নি। 
তখন শয়তান বলল; হে আল্লাহ, আপনী জানেন মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু “তার জীবন” আর সে তার নিজ প্রানের ভয়েই তো এখনো আপনার প্রতি অনুগত আর আপনাকে ভয় পায়। 
তখন আল্লাহ বললেন; ঠিক আছে তার শরীরও আমি তোমার হাতে তুলে দিলাম কিন্তু আমার কসম রইল তুমি তার প্রানটুকু অন্তত নিও না। 
আর মনে রেখ তার বিরুদ্ধে এই সমস্ত ষড়যন্ত্রের জন্য তোমাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। 

তখন শয়তান আইয়ুব (আঃ) শরীরে রোগ জীবানু ছড়িয়ে দিল আর তাতে তার পুরো শরীরে দগদগে ঘা হয়ে গেল এবং শরীরের মাংস পচার দুঃর্গন্ধ তার শরীর থেকে বেরুতে লাগল এবং প্রতিবেশীরা তাকে দুরে নির্জন একটি স্থানে রেখে আসল। তার স্ত্রীও সৃষ্টিকর্তাকে অভিশাপ দিতে দিতে তাকে ছেড়ে চলে গেল। মৃত্যুপথ যাত্রী আইয়ুব তবুও একা একা আল্লাহর ইবাদাত করতে লাগল কিন্তু ভুলেও কখনো আল্লাহকে দোষারোপ করলেন না এবং নিজের বিগত দিনের ভাল কাজগুলির বিনিময়ে আল্লাহর কাছে প্রতিদানও চাইলেন না। 

শয়তান তার ষড়যন্ত্রে সফল হল না এবং একদিন তার দলবল নিয়ে আইয়ুব (আঃ) এর কাছ থেকে একদিন পলায়ন করল। 

কিন্তু আল্লাহ পুনরায় হযরত আইয়ুব (আঃ) কে তার নব্যুয়াত ফিরিয়ে দিলেন এবং পুর্বের চেয়েও অধিক সম্মান ও ধন-সম্পত্তি দান করলেন। আর তার মেয়েরা হল দেশের সেরা সুন্দরী আর সম্মানিত নারীদের অন্তর্ভুক্ত। এবং হযরত আইয়ুব (আঃ) আবার পুর্বের ন্যায় তার জাতির মধ্যে শান্তির বানী প্রচার করতে লাগলেন।

Comments