সানডে লেকচার অফ বাংলাদেশ ব্যাপ্টিস্ট চার্চ (১২ মে ২০১৩ ইং)

সবাইকে ইম্মানুয়েল। আজ বিশ্ব মা দিবসে সবাইকে খ্রিস্টিয় প্রীতি ও শুভেচ্ছা। ইশ্বরকে অসংখ্য ধন্যবাদ তিনি এক সপ্তাহ পরে আবার আমাদের সবাইকে একসাথে মিলিত হবার সুযোগ দিয়েছেন, আমাদের সুস্থ রেখেছেন। আদি পুস্তকের প্রথম অধ্যায়ের আটাশ পদে বলা হয়েছে; ইশ্বর তাদের আর্শীবাদ করে বললেন, তোমরা বংশবৃদ্ধির ক্ষমতায় পুর্ন হও আর নিজেদের সংখ্যা বাড়িয়ে পৃথিবী ভরে তোল এবং পৃথিবীকে নিজেদের শাসনের অধীনে আন। এছাড়া তোমরা সমুদ্রের মাছ, আকাশের পাখী এবং মাটির উপরে ঘুরে বেড়ানো প্রতিটি প্রানীর উপরে রাজত্ব কর। আদি পুস্তকের তৃতীয় অধ্যায়ের বিশ পদে বলা হয়েছে; আদম তার স্ত্রীর নাম দিলেন হবা (যার মানে জীবন) কারন তিনি সমস্ত জীবিত লোকদের মা হবেন। আজ বিশ্ব মা দিবস কিন্তু আমরা কতটুকু মায়ের প্রতি দায়িত্বগুলি পালন করি? পশ্চিমা সংস্কৃতি যদিও এখনো আমাদের মাঝে সেভাবে আসে নি, আমরা চেষ্টা করি মায়েদের নিজের কাছেই রাখার জন্য কিন্তু অনেকে আছেন যারা শহরে চাকরি করেন, ভাল বাসায় থাকেন কিন্তু বৃদ্ধ মা’কে রাখার জন্য একটুখানি জায়গা তার বাসায় হয় না। রাশিয়ান লেখক ইভানের একটি বই থেকে আমি কিছু ঘটনা টানছি, জানি না ঘটনাটা সত্যি কিনা। বাংলাদেশের ইমদাদুল হক মিলনও এমন একটি একটি লেখা লিখেছিলেন। ঘটনাটা এমন; এক মা তার সন্তানকে খুবই ভালবাসত। এতটাই ভালবাসত যে, ছেলেটা যখন ছোট সে কখনো সন্তানকে মাটিতে রাখেনি যদি পিপড়ায় তাকে কামড়ায়, মাথার উপরে রাখেননি যদি মাথার উকুনু তাকে কামড়ায়। খুব আদর যত্ন করে তাকে বড় করে তুলল। একদিন সেই ছেলে বড় হয়ে এক মেয়ের প্রেমে পড়ল। মেয়েটি প্রথমে তাকে পাত্তা দিত না কিন্তু অনেক চেষ্টার পরে মেয়েটি রাজী হল এবং বলল; তুমি তো তোমার মা’কে খুব ভালবাস, কিন্তু আমাকে কতটা ভালবাস সেই পরীক্ষা তোমাকে দিতে হবে। তোমার মায়ের হ্দপিন্ড আমাকে এনে দিতে হবে। ছেলেটি মেয়েটিকে বলল; আমার মা আমাকে খুব ভালবাসে, তিনি আমার জন্য সবকিছু করতে পারেন। আমি মাকে গিয়ে বলে দেখি। তিনি কি বলেন। যথারীতি ছেলেটি বাসায় গিয়ে তার মাকে বলল। উত্তরে ছেলেটির মা তাকে বলল; আমার ছেলে আমার জীবন, আমার হৃদয়। আমার জীবন আমার কাছে জীবন চেয়েছে আমি দেব না তা কি হয়? ঠিক আছে তুমি আমাকে হত্যা করে আমার হৃদপিন্ড নিয়ে তোমার প্রেমিকাকে দাও। ছেলেটি মাকে হত্যা করে মায়ের হৃদপিন্ড নিয়ে রাস্তা দিয়ে দৌড়াচ্ছিল হঠাৎ সে হোচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে যায়, তার হাত থেকে হৃদপিন্ডটা ছিটকে পড়ে যায়। ছেলেটি শুনতে পায় তার মা তাকে বলছে; ব্যাথা পেয়েছিস বাবা? প্রকৃতপক্ষে এই গল্পটা দ্বারা মায়ের ভালবাসার প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমাদের মা আমাদের কাছে কতটা মুল্যবান অনেক সময় আমরা সেটা বুঝতে পারি না। প্রথম রাজাবলি তৃতীয় অধ্যায়ে মায়ের ভালবাসার একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। দুজন বেশ্যা স্ত্রীলোক একই গৃহে থাকত এবং তাদের দুটি ছেলে সন্তান হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পরে এক রাতে একজনের সন্তানটি মারা গেলে সে রাতের আধারে তার মৃত বাচ্চাকে অন্য মায়ের কোলে রেখে জীবিত বাচ্চাটি চুরি করে আনল কিন্তু প্রকৃত মা বাদশা সোলায়মানের কাছে বিচার দিল তার ছেলেকে ফিরিয়ে দেবার জন্য। বাদশা সোলায়মান বললেন; দুজনেই যেহেতু ছেরেটির মাতৃত্বের দাবী করছে, ঠিক আছে আমি ছেলেটিকে কেটে দু‘টুকরো করে দুজনকে দিব। তিনি সন্তানটিকে কাটার জন্য যখন তলোয়ার তুলেছেন তখন প্রকৃত মা বলল; ঠিক আছে আমার ছেলের প্রয়োজন নেই, আপনী ছেলেটিকে ওই মহিলার কোলেই দিয়ে দিন তবুও তো আমার সন্তান বেচে থাকুক। বাদশা সোলায়মান বললেন; ছেলেটিকে এই মায়ের কাছে ফিরিয়ে দাও কারন এই মহিলাটিই তার প্রকৃত মা। ইপিষীয় ছয় অধ্যায়ের প্রথম তিন পদে বলা হয়েছে; ছেলে মেয়েরা, প্রভু যেভাবে চান সেইভাবে তোমরা মা-বাবার বাধ্য হয়ে চল, কারন সেটাই হওয়া উচিত। পবিত্র শাস্ত্রে প্রথম যে আদমের সাথে প্রতিজ্ঞা করা হয়েছে তা এই- তোমার মা বাবাকে সম্মান কর যেন তার মংগল হয় এবং তুমি অনেকদিন পর্যন্ত পৃথিবীতে বেচে থাকতে পারবে। ছোটবেলায় আমি বেশী করে ঠাকুর’মার কাছে কাছে থাকতাম, তিনি একদিন আমাকে একটি সত্য ঘটনা বলেছিলেন, আর সেটা হল এমন যে একলোকের বৃদ্ধ মা মারা যাবার পরে তিনি মায়ের সমাধির উপরে অনেক টাকা খরচ করে বিশাকৃতির একটি মঠ নির্মান করে বললেন; আমার মায়ের যত ঋন, মায়ের দুধের ঋন আজ আমি শোধ করে দিলাম। ঠাকুরমা আমাকে বললেন; কিছুদিন পরে সেই বিশাল মঠটি একধারে হেলে পড়ল। মায়ের একফোটা দুধের দাম কি কখনো শোধ করা যায়? তাইতো ফকির আলমগীর গেয়েছেন; মায়ের একফোটা দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের চাম-পাপস বানাইয়া দিলেও শোধ হবে না। মায়ের দোয়া, মায়ের আর্শীবাদ হচ্ছে সন্তানের জন্য জীবন। হিতোপদেশ তৃতীয় অধ্যায়ের বাইশ পদে বলা হয়েছে; তোমার জন্য তা হবে জীবন, তোমার গলার জন্য তা হবে সুন্দর হারের মত। বৃদ্ধ মা বাবাকে ভালবাসতে হবে, তাদের প্রাপ্য সম্মান তাদের দিতে হবে। মা বাবা বৃদ্ধ হয়ে গেলে অনেক সন্তানরা তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে থাকে। মায়ের প্রতি ছোটবেলার মত সেই আদর, ভালবাসা আর সম্মানবোধ থাকে না। লেবীয় পুস্তকের উনিশ অধ্যায়ের বত্রিশ পদে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সম্মানের ব্যপারে বলা হয়েছে; যারা বৃদ্ধ তারা কাছে আসলে উঠে দাড়াতে হবে এবং তাদের সম্মান করতে হবে। তোমরা তোমাদের ইশ্বরকে ভক্তিপুর্ন ভয় করবে। আমি সদাপ্রভু। আমাদের সবাইকে খেয়াল হবে নিয়মিত কর্মব্যাস্ততার মাঝেও আমরা যেন আমাদের বৃদ্ধ মা বাবার প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্যগুলি ভুলে না যাই। আজ বিশ্ব মা দিবসে সবাইকে আবারও খ্রিষ্টিয় প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আমেন। 


বাংলাদেশ ব্যাপ্টিস্ট চার্চের সানডে লেকচার 
১২ মে ২০১৩ ইং 
স্পিকার: রেভারেন্ড সুশান্ত বৈরাগী 
পালক, বাংলাদেশ ব্যাপ্টিস্ট চার্চ 
সভাপতি, বাংলাদেশ ব্যাপ্টিস্ট সংঘ।

Comments