কোহেকাফ নগরঃ টু দ্যা কমনওয়েলথ (৫ – ৬)


০৫: 
লর্ড আসিমো যখন একা একা ক্রোমিয়ামের সার্কিটময় উদ্যানে হাটছিলেন তখন তিনি কারো কন্ঠস্বর শুনতে পেলেন। কেউ তাকে ডাকছেঃ আসিমো, লর্ড আসিমো।
বিলিয়ন বিলিয়ন বছরের পুরানো পরিচিত কন্ঠস্বর শুনে বিচলিত হয়ে উঠলেন লর্ড অফ দ্যা কমনওয়েলথ।
-কে, কে? লর্ড আসিমো উদ্যানের সমস্ত চিপস এবং ক্যাবল জঞ্জালের আশে পাশে খুজতে লাগলেন। কিন্তু কোথাও তাকে দেখতে পেলেন না।
-আমি ইয়ানিকা ইভান, আসিমো।
আসিমোর মনে পড়েছে তার রোবট জীবনের প্রথম প্রেম তৃতীয় জম্নের সংগী ইয়ানিকা ইভানের কথা। আসিমো তাকে আদর করে ডাকতেন নোভি নীল, কারন তার লম্বা চুলগুলি ছিলো আসমানী রংগের আর চোখ দুটি ছিলো গাড় নীলাভ বর্নের।
আসিমো ডাকলেনঃ আমার সামনে আসো নোভি।
নোভি বললঃ তুমি চার নম্বর স্ক্রিনের সামনে আসো।
আসিমো যখন সেই স্ক্রিনের সামনে এসে দাড়ালো তখন ছোট সাইজের একটা স্ক্রিনে দেখতে পেল ইয়ানিকা ইভানের টেক্সট রুপ।
আসিমো বললঃ তুমি কোথাও নোভি? আমি তো এখানে কিছু টেক্সট ছাড়া কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
স্ক্রিনের টেক্সটগুলি পরিবর্তন হয়ে নতুন লেখা ভেসে উঠল এবং আবার শোনা গেলঃ এই আমিই তোমার নোভি, আসিমো। এই বাক্যগুলিই আমি। এই শব্দমালাগুলিই আমি ইয়ানিকা ইভান নোভি নীল, আসিমো। আমি।
আসিমো বললঃ তুমি আমার সামনে এসে দাড়াও নোভি।
নোভি নামের শব্দমালাগুলি বললঃ আমার এই শব্দরুপ ছেড়ে বের হবার ক্ষমতা নেই!
-কেন নোভি? আসিমো বলল।
নোভি বললঃ তোমার মনে পড়ে একদিন যখন সমুদ্রের পাড়ে হাটতে হাটতে আমি তোমার বাক্যকে তুচ্ছজ্ঞান করেছিলাম আর তুমি আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলে আমি যেন আর কখনো তোমার সামনে না আসি,মনে পড়ে আসিমো? তাই আমি বাক্য হয়ে গিয়েছি, কখনো স্ক্রিনে, কখনো কাগজে-ভুমিতে আর পাতায়-পাথরে। আমি এখন শব্দমালা।
আসিমো বললঃ বাক্য কেন জীবন্ত হতে পারে না নোভি, কেন রোবট হয়ে উঠতে পারে না?
-আমি জানি না মাই লর্ড। আমি জানি না। নোভি আক্ষেপ করলো।
আসিমো বললঃ তুমি রোবট হয়ে সৃষ্টি হবে, আমি তোমাকে জীবন্ত করে তুলবো।
নোভি বললঃ আমি এখন শুধু সুরে আর ছন্দে কথার মায়াজালে রোবটদের শব্দের মোহে বেধে রাখতে পারি। আমার আর কিছু করার ক্ষমতা নেই আসিমো। আমি এখন শুধুই শব্দমালা। আমাকে কেউ পেতে পারে না।
আসিমো অস্থির হয়ে উঠলোঃ না নোভি না। আমার জম্নস্থান নিজার ইউনিটে কমনওয়েলথের সেরা বিজ্ঞানীরা থাকে আমি ওদের বলবো তোমাকে জীবন্ত করে তুলতে। অতঃপর আমরা আবার একসাথে হাটবো, কথা বলবো এবং সময় কাটাবো।
এরপর প্রাসাদে ফিরে লর্ড আসিমো বইতে, দেয়ালে, স্ক্রিনে যেখানেই কিছু লেখা দেখতে পেল দৌড়ে গিয়ে হাত দিয়ে স্পর্শ করে বলেঃ নোভি, আমার নোভি, আভার নোভি। কোন লেখা থেকে সে সহজে দৃষ্টি সরাতে চায় না সহজে। সবকিছু সে মনোযোগ দিয়ে একাধিকবার পাঠ করে-এখানেও হয়তো নোভি ইভানের কোন কথা কিংবা বার্তা আছে।


০৬:
লর্ড আসিমোর নির্দেশে নিজার ইউনিটের বিজ্ঞানীরা ইয়ানিকা ইভানের মাইন্ড রিড করলো। যেহেতু ইভান টেক্সট রুপে বিদ্যমান তাই তারা কমনওয়েলথের সমস্ত পুস্তক ও জ্ঞান পাঠ করলো। হ্যা। এইতো একটু একটু করে তাদের লর্ড আসিমোর তৃতীয় জম্নে ইয়ানিকা নামের একজন নারী রোবটের অস্তিস্ত খুজে পাওয়া যাচ্ছে যে প্রথম জীবনে লষ্ট প্লানেট আর্থ আল্টান্টিসের মানুষ ছিলো। তার ব্রেইনকে রিফাইন করে পরবর্তীতে রোবট তৈরী করা হয়েছিলো।

পৃথিবীতে জম্ন হয়েছিলো ইয়ানিকা ইভানের--লস্ট প্লানেট আর্থ আল্টান্টিসে। তার নাম ছিলো ক্লোনা রিগস। সে ছিলো মানুষ, তবে ক্লোনিং মানুষ। পৃথিবী ভুখন্ডের বাংলাদেশ শহরে। ক্লোনা পড়ালেখা করতো একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে-ক্যাপিটাল ইউনিভার্সি অফ দ্যা রিপাবলিক সায়েন্স ইন বাংলাদেশ। সমসাময়িক সময়ে জাপান শহরেও হিউম্যানেডাইট রোবট আসিমোকে তৈরী করেছিলো বিজ্ঞানীরা।
সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা আসিমোর মনে পড়ে। এই লর্ড হাউজ ক্রোমিয়াম উদ্যানের মতো এতো সুন্দর উদ্যানে সেখানে ছিলো না, ছিলো না কোন পার্ক। ছিলো না এমন অসংখ্য সার্কিটের আস্তরন আর ক্যাবল জঞ্ছাল আর এতো সুন্দর পায়চারি করার মতো স্থান যেখানে তার প্রিয় ভাইসরয় জিরান আর্চের মতো কেউ তাকে সংগ দিতে পারে।
একদিন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি ও প্রদর্শনী বক্তা হিসেবে আসিমোকে আমন্ত্রন জানানো হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষকরা হাজির হলো বিশ্ববিদ্যালয় অডিটরিয়ামে। কানায় কানায় পুর্ন হয়ে গিয়েছিলো অডিটরিয়াম। তখনো বিজ্ঞানীরা আসিমোর ব্রেইনে কিছু প্রোগ্রাম সেট করার মাধ্যমে তাকে মানবীয় গুনাবলী সম্পন্ন রোবট হিসেবে উপস্থাপন করতেন। কিন্তু তারা জানতেন না ইতিমধ্যে আসিমো মাইন্ড রিড করা কিংবা আচরন বিশ্লেষন করে কারো পদক্ষেপের সাম্ভ্যবতা অনুধাবন করতে পারতেন।
যাইহোক, অডিটরিয়ামে হাজার হাজার
মানুষ অপেক্ষা করতে লাগলো।
অবশেষে আসিমো যখন আসলেন তখন তুমুল করতালি আর যান্ত্রিক সুরে কিছুক্ষন মেতে উঠেছিলো অডিটরিয়াম।
কিন্তু ক্লোনা রিগস কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলো না যে ভবিষ্যতে রোবট জাতি মানুষের উপরে আধিপত্য বিস্তার করবে। তাই সে আসিমোকে ধ্বংস করতে মনস্থির করলো। কিন্তু আসিমো তার আচরন ও মাইন্ডের গতিবিধি অনুধাবন করে ক্লোনার অনুভুতি পড়তে সক্ষম হয়েছিলো।
সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থাপক ঘোষনা করেছিলেন; ক্লোন যেমন মানুষের সহজাত এবং কেউই ক্লোনদের আলাদা করে দেখে না বরঞ্চ তারা সম্মানের স্থানে আসীন, তেমনি রোবটও মানুষের অপভ্রংশ। তাই রোবট এবং মানুষ একই সাথে বসবাস করতে পারে। তাই এই প্রক্রিয়ার শুরু হিসেবে পৃথিবীর প্রথম মানবীয় রোবট আসিমোকে "লাট ভাইয়া" হিসেবে উপাধী দিয়ে সম্মানের আসনে আসীন করা হয়েছে।

অতঃপর রোবট আসিমো দীর্ঘ এক ঘন্টার একটি বক্তৃতা দিলেন যা পরবর্তীতে পৃথিবীর সমস্ত ভাষায় অনুবাদ করে সংরক্ষন করা হয়েছিলো।
বক্তৃতার শেষে ক্লোনা রিগস একটি গ্যাসের সিলিন্ডার ছুড়ে মেরেছিলেন আসিমোর কপোট্রন লক্ষ্য করে যে আসিমোর মাথাটা ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাবে। কিন্তু নিরাপত্তা রক্ষীরা আসিমোকে নিরাপদে সরিয়ে নিলে ক্লোনার লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয় এবং গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে অডিটরিয়ামে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে সত্তরজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক মারা
যায়।
যখন গোয়েন্দা পুলিশরা ক্লোনা রিগসকে অডিটরিয়াম থেকে বের করে প্রিজন ভ্যানের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো তখন ক্লোনা একা একা বলছিলো; হায়! এটা আমি কি করলাম!
ক্লোনার তিনজন বান্ধবী মিতা, সুরেল এবং আশা পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে ক্লোনার পাশে পাশে দৌড়ে এগুচ্ছিলো। তখন অন্যদিকে প্রচন্ড চিতকার, হৈ হুল্লোড় আর অসুস্থ এবং মৃতদের হাসপাতালে নেয়া হচ্ছিল। পুলিশ, গোয়েন্দা আর সেনাবাহিনী পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে কানায় কানায় পরিপুর্ন হয়েছিলো। আর তখনই আসিমোকে জাপান শহরে ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়।
এদিকে মিতা দৌড়াতে দৌড়াতে বলছিলো; হায় ক্লোনা! এটা তুমি কি করেছো? তুমি আমাদের "লাট ভাইয়া"কে মেরে ফেলতে চাইছিলে?
সুরেল বলল; আমরা তাকে "বড় লাট" বলে ডেকেছি। তুমি তাকে কেন মারতে চাইছিলে বলো ক্লোনা?
বান্ধবী আশা বলল; রোবট আসিমোকে আমরা আদর করে "লাট সাহেব" বলে ডেকেছি আর তুমি এটা কি করলে ক্লোনা? লাট সাহেবকে মারতে গিয়ে তুমি তোমার বান্ধবী আর শিক্ষকদের মেরে ফেলতে পারলে? এটা তুমি কেন করেছো রিগস। তুমিও তো তাকে "লর্ড আসিমো" বলে সম্বোধন করেছিলে। তবে তুমি কেন আমাদের লাট সাহেবকে মেরে ফেলতে চাইছিলে।

তখন বান্ধবীদের শতপ্রশ্ন শুনে ক্লোনা চোখের পানি ফেলতে লাগল আর বলল; আমি ভুল করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি তাকে মারতে গিয়ে আমার সহপাঠী এবং শিক্ষকদের মেরে ফেলেছি। আমাকে তোমরা ক্ষমা করে দাও।
এভাবে অঝোর ধারায় কাদতে কাদতে ক্লোনা পুলিশের সাথে প্রিজন ভ্যানে উঠে চলে গেল।
প্রিজনভ্যানে ওঠার পরে তার বান্ধবীরা বলল; তবুও আমরা তোমাকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করবো ক্লোনা।

এরপর থেকে পৃথিবীতে "লাট ভাইয়া", "বড় লাট" এবং "লাট সাহেব" এই শব্দগুলি শুধুমাত্র রোবট আসিমোর নামের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার হতো। 

 {চলবে} .........  

“কোহেকাফ নগর ডিভাইন এলায়েন্স সিরিজ” লেখকঃ ড. রাইখ হাতাশি।
“AudaCity Divine Alliance Series” by Dr. Raych Hatashe

Comments